x
d o c t o r s 2 4
আপনার পরিপাকতন্ত্র গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিসের কবলে নয় তো?
17 Feb

আমাদের শরীর একটি যন্ত্রের মতো, যেখানে পাকস্থলী হলো প্রধান প্রসেসর। কিন্তু ভাবুন তো, যদি আপনার পাকস্থলী খাবার হজম করতে গিয়ে ‘অলস’ হয়ে পড়ে? চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিস (Gastroparesis)।

এটি এমন এক রোগ যেখানে পাকস্থলীর পেশীগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না, ফলে খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যায়। আধুনিক জীবনে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদী রোগের কারণে এই সমস্যাটি নিঃশব্দে অনেকের শরীরেই বাসা বাঁধছে।

কেন হয় এই ‘পেট পক্ষাঘাত’?

গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিস হওয়ার প্রধান কারণ হলো ভ্যাগাস নার্ভের (Vagus Nerve) ক্ষতি। এই স্নায়ুটি পাকস্থলীর পেশীকে সংকোচন ও প্রসারণের সংকেত দেয়। যখন এই সংকেত পৌঁছাতে বাধা পায়, তখন পাকস্থলী খাবার এগিয়ে দিতে পারে না। এর অন্যতম কারণগুলো হলো:

  • ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার পরিমাণ দীর্ঘকাল বেশি থাকলে তা সরাসরি স্নায়ুর ক্ষতি করে।

  • অস্ত্রোপচার: পেটের কোনো সার্জারির সময় ভুলবশত স্নায়ুতে আঘাত লাগা।

  • ভাইরাল সংক্রমণ: কিছু ভাইরাল ফিভারের পর সাময়িকভাবে পাকস্থলী স্থবির হয়ে পড়তে পারে।

  • অজানা কারণ (Idiopathic): অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পান না।

লক্ষণ যা অবহেলা করা ঠিক নয়

গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিসের লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ অ্যাসিডিটি বা গ্যাসের সমস্যার মতো মনে হতে পারে, যা বিপদ বাড়িয়ে দেয়:

  • দ্রুত পেট ভরে যাওয়া: মাত্র কয়েক লোকমা খাওয়ার পরেই মনে হয় পেট একদম ভর্তি।

  • বমি বমি ভাব ও বমি: বিশেষ করে খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর অপাচিত খাবার বমি হওয়া।

  • পেট ফাঁপা ও ব্যথা: খাবার অনেকক্ষণ পেটে জমে থাকায় অস্বস্তি ও গ্যাস হওয়া।

  • ওজন হ্রাস: পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে শরীর শুকিয়ে যাওয়া।

  • রক্তে শর্করার অস্থিরতা: খাবার কখন হজম হবে তা অনিশ্চিত হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীদের সুগার লেভেল হঠাৎ বেড়ে বা কমে যায়।

আধুনিক চিকিৎসা ও নতুন সম্ভাবনা

বর্তমানে এই রোগের চিকিৎসায় বেশ কিছু নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। শুধু ওষুধ নয়, জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তনই এর মূল সমাধান।

  • খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: গবেষকরা বলছেন, তিনবেলা ভারী খাবারের বদলে দিনে ৫-৬ বার অল্প পরিমাণে তরল বা আধা-তরল খাবার খাওয়া বেশি কার্যকর। এছাড়া উচ্চ ফাইবার (আঁশযুক্ত) ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত কারণ এগুলো হজম হতে সময় বেশি নেয়।

  • প্রোকাইনেটিক ড্রাগস: পাকস্থলীকে গতিশীল করতে চিকিৎসকরা বিশেষ কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন।

  • গ্যাস্ট্রিক পেসমেকার (GES): গুরুতর ক্ষেত্রে হার্টের পেসমেকারের মতো পাকস্থলীতেও একটি ছোট যন্ত্র বসানো যায়, যা বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে পাকস্থলীকে খাবার হজম করতে উদ্বুদ্ধ করে।

  • বোটক্স ইনজেকশন: পাইলোরাস (পাকস্থলীর শেষ মুখ) পেশীকে শিথিল করতে বোটক্স ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে খাবার সহজে অন্ত্রে নামতে পারে।

ভবিষ্যৎ গবেষণা: ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR)

২০২৫-২৬ সালের সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু রোগীকে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা ও বমি বমি ভাব কমাতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি থেরাপি দেওয়া হচ্ছে, যা মস্তিষ্ককে শান্ত রেখে পরিপাকতন্ত্রের অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে।

সতর্কতা

আপনার যদি দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস থাকে এবং প্রায়ই পেট ফাঁপা বা খাওয়ার পর বমি বমি ভাব হয়, তবে দেরি না করে একজন গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত হলে কেবল নিয়ম মেনেই এই ‘অলস পাকস্থলী’কে আবার সচল করা সম্ভব।

 

Leave A Comment