সারভিকাল ক্যান্সার বা জরায়ুমুখের ক্যান্সার নারীদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)–এর দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণই এই ক্যান্সারের প্রধান কারণ। আশঙ্কার বিষয় হলো, রোগটি হঠাৎ করে হয় না; ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার অন্তত এক বছর আগেই শরীরে কিছু সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। এসব লক্ষণ সময়মতো শনাক্ত করা গেলে সারভিকাল ক্যান্সার প্রায় সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
নিচে সারভিকাল ক্যান্সারের ১ বছর আগে শরীরে দেখা দিতে পারে এমন ৭টি লক্ষণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো—
১. মাসিকের বাইরে অস্বাভাবিক রক্তপাত
মাসিক শেষ হওয়ার পর, সহবাসের পর কিংবা হঠাৎ করে রক্তপাত হওয়া সারভিকাল ক্যান্সারের অন্যতম প্রাথমিক সতর্ক সংকেত। অনেক নারী এটিকে হরমোনজনিত সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করেন। অথচ এটি জরায়ুমুখের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে।
২. সহবাসের সময় ব্যথা বা অস্বস্তি
যদি নিয়মিত সহবাসের সময় ব্যথা অনুভূত হয় বা রক্তপাত হয়, তবে সেটি স্বাভাবিক নয়। জরায়ুমুখে প্রাক-ক্যান্সারাস কোষ তৈরি হলে এই ধরনের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, যা প্রায় এক বছর আগেই শুরু হয়।
৩. যোনি স্রাবের রং, গন্ধ বা ঘনত্বে পরিবর্তন
সারভিকাল ক্যান্সারের আগাম পর্যায়ে যোনি স্রাব অতিরিক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত বা পানির মতো পাতলা হতে পারে। কখনো কখনো স্রাবে রক্তের আভাসও থাকে। এই পরিবর্তন দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অবশ্যই সতর্ক হওয়া জরুরি।
৪. তলপেট ও কোমরের নিচে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
মাসিকের সঙ্গে সম্পর্কহীন তলপেট বা কোমরের নিচের ব্যথা অনেক সময় নারীরা গ্যাস্ট্রিক বা পিঠের সমস্যা মনে করেন। কিন্তু এই ব্যথা যদি মাসের পর মাস স্থায়ী হয়, তবে তা জরায়ুমুখে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
৫. প্রস্রাবে বা মলত্যাগে সমস্যা
সারভিকাল ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে জরায়ুমুখের আশপাশের টিস্যুতে চাপ পড়তে শুরু করে। ফলে ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ, প্রস্রাবের সময় জ্বালা কিংবা মলত্যাগে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এই লক্ষণগুলো সাধারণ ইউরিন ইনফেকশনের মতো মনে হলেও দীর্ঘস্থায়ী হলে পরীক্ষা জরুরি।
৬. অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও ওজন কমে যাওয়া
ক্যান্সারজনিত কোষ পরিবর্তনের সময় শরীরের শক্তি ক্ষয় হতে থাকে। এর ফলে পর্যাপ্ত ঘুম ও খাবার সত্ত্বেও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি এবং অকারণে ওজন কমে যাওয়া দেখা দিতে পারে। এই লক্ষণটি সাধারণত রোগের আগাম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
৭. পায়ে হালকা ফোলা বা ভারী ভাব
জরায়ুমুখের অস্বাভাবিক কোষ ধীরে ধীরে লিম্ফ নোডে প্রভাব ফেললে পায়ে ফোলা বা ভারী ভাব অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় এটি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফল মনে হলেও, কারণ অজানা হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
কেন আগেভাগে শনাক্তকরণ সবচেয়ে কার্যকর
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্যাপ স্মিয়ার ও HPV টেস্টের মাধ্যমে সারভিকাল ক্যান্সার হওয়ার আগেই কোষগত পরিবর্তন ধরা সম্ভব। প্রাক-ক্যান্সারাস পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসা সহজ, কম খরচের এবং সাফল্যের হার প্রায় ৯৫ শতাংশের বেশি।
করণীয় কী?
২১ বছর বয়সের পর নিয়মিত প্যাপ টেস্ট, HPV ভ্যাকসিন গ্রহণ এবং নিরাপদ যৌনাচার সারভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধের প্রধান উপায়। শরীরের এই আগাম লক্ষণগুলো চিনে নেওয়াই সুস্থ ও নিরাপদ জীবনের প্রথম শর্ত।
