ব্ল্যাডার ক্যান্সার বা মূত্রথলির ক্যান্সার এমন একটি রোগ, যা প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই নীরব থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এটি ধরা পড়ে দেরিতে, কারণ শুরুতে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়, সেগুলোকে সাধারণ ইউরিন ইনফেকশন বা সাময়িক শারীরিক সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়।
তবে গবেষণা ও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রোগটি শনাক্ত হওয়ার প্রায় ১–২ মাস আগেই শরীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক বার্তা দিতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো সময়মতো চিনতে পারলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়। নিচে ব্ল্যাডার ক্যান্সারের এমন ৬টি লক্ষণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
১. প্রস্রাবে রক্ত দেখা দেওয়া (হেমাচুরিয়া)
ব্ল্যাডার ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো প্রস্রাবে রক্ত থাকা। কখনো কখনো রক্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়, আবার অনেক সময় এটি মাইক্রোস্কোপিক হওয়ায় খালি চোখে ধরা পড়ে না। আশ্চর্যের বিষয়, এই রক্তপাত অনেক ক্ষেত্রে ব্যথাহীন হয়, ফলে রোগী বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে “পেইনলেস হেমাচুরিয়া” বলা হয়, যা ব্ল্যাডার ক্যান্সারের একটি ক্লাসিক সতর্ক সংকেত।
২. ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ অনুভব করা
হঠাৎ করে বারবার প্রস্রাবের বেগ পাওয়া বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বার টয়লেটে যেতে হওয়া একটি প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। ব্ল্যাডারের ভেতরে টিউমার তৈরি হলে তা মূত্রথলির দেয়ালকে উত্তেজিত করে, ফলে অল্প প্রস্রাব জমলেও বারবার চাপ অনুভূত হয়। অনেকেই এটিকে পানির পরিমাণ বেশি খাওয়া বা সাধারণ ইউরিন সমস্যার ফল বলে ভুল করেন।
৩. প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা
প্রস্রাব করার সময় জ্বালা, পোড়া পোড়া ভাব বা হালকা ব্যথা সাধারণত ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের লক্ষণ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু যদি এই সমস্যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং অ্যান্টিবায়োটিকেও না কমে, তাহলে তা ব্ল্যাডার ক্যান্সারের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণকে অবহেলা করা বিপজ্জনক।
৪. প্রস্রাবের প্রবাহে পরিবর্তন
প্রস্রাবের ধারা হঠাৎ দুর্বল হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব শুরু করতে সময় লাগা বা প্রস্রাব শেষ হওয়ার পরও মনে হওয়া যে ব্ল্যাডার পুরোপুরি খালি হয়নি—এসব পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। ব্ল্যাডারের ভেতরে বা মূত্রনালির মুখে টিউমার থাকলে প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়।
৫. তলপেটে বা কোমরের নিচে অস্বস্তি
ব্ল্যাডার ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে তীব্র ব্যথা না থাকলেও তলপেটে ভারী ভাব, চাপ বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় এই অস্বস্তি কোমরের নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। রোগীরা প্রায়ই এটিকে গ্যাস বা সাধারণ পেটের সমস্যা মনে করে উপেক্ষা করেন।
৬. অকারণ ক্লান্তি ও হালকা রক্তস্বল্পতা
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই সব সময় দুর্বল লাগা, কাজের প্রতি অনীহা বা মাথা ঘোরা ব্ল্যাডার ক্যান্সারের একটি পরোক্ষ লক্ষণ হতে পারে। প্রস্রাবে দীর্ঘদিন অল্প অল্প রক্তক্ষরণের ফলে শরীরে ধীরে ধীরে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হয়, যা রক্তস্বল্পতা ও ক্রনিক ফ্যাটিগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কেন দ্রুত চিকিৎসা জরুরি
ব্ল্যাডার ক্যান্সার যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, তাহলে এন্ডোস্কোপিক সার্জারি, ইমিউনোথেরাপি বা স্থানীয় চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো ফল পাওয়া যায়। দেরিতে ধরা পড়লে ক্যান্সার আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তাই উপরোক্ত লক্ষণগুলোর যেকোনোটি যদি ১০–১৪ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, বিশেষ করে ধূমপানকারী, রাসায়নিক কারখানায় কাজ করা ব্যক্তি বা যাদের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, তাদের দ্রুত ইউরোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
শরীরের দেওয়া ছোট সংকেতই অনেক সময় বড় বিপদের আগাম বার্তা দেয়। সচেতন থাকাই পারে ব্ল্যাডার ক্যান্সারের মতো নীরব রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হতে।
