বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য উদ্বেগ, যা প্রায় ১০% প্রজনন বয়সের নারীকে প্রভাবিত করে। এই রোগে জরায়ুর আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়, যা তীব্র ব্যথা এবং ইনফার্টিলিটির কারণ হয়। তবে, সঠিক নির্ণয়ে গড়ে ৭-৮ বছর দেরি হওয়া এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও জটিল করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং সীমিত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এই দেরির প্রধান কারণ।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে ৬৫% প্রাথমিকভাবে ভুল নির্ণয়ের শিকার হন, কারণ লক্ষণগুলো প্রায়শই সাধারণ মাসিক ব্যথা বা অন্যান্য গাইনোকোলজিক সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, তীব্র পেলভিক ব্যথা বা অতিরিক্ত রক্তপাতকে অনেক সময় “স্বাভাবিক” বলে ধরে নেওয়া হয়।
এন্ডোমেট্রিওসিস-অ্যাডেনোমায়োসিস সোসাইটি অব বাংলাদেশ (EASB) জানিয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় ট্রান্সভ্যাজিনাল আল্ট্রাসাউন্ড বা ল্যাপারোস্কোপির মতো উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা প্রায় অপ্রতুল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে এই সুবিধাগুলোর অভাব আরও তীব্র।
চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। EASB-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে এন্ডোমেট্রিওসিস বিশেষজ্ঞ গাইনোকোলজিস্টের সংখ্যা মাত্র ৮০-১০০, যা ১৮ কোটি জনসংখ্যার জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল। অনেক চিকিৎসক এই রোগের জটিল লক্ষণ শনাক্ত করতে প্রশিক্ষিত নন, ফলে রোগীরা দীর্ঘদিন অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা ভুল চিকিৎসার শিকার হন।
একটি নতুন উদ্যোগে, EASB এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৫ সালে উপজেলা পর্যায়ে ৩০০ চিকিৎসকের জন্য ল্যাপারোস্কোপি এবং এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয় প্রশিক্ষণ কর্মশালা চালু করেছে। এই প্রোগ্রাম ইতোমধ্যে ১৫০ জন চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যার ফলে নির্ণয়ের দেরি ২০% কমেছে বলে প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে।
অন্যদিকে, সচেতনতার অভাবও একটি বড় বাধা। সামাজিক মাধ্যমে #EndoAwarenessBD ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে নারীরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন, যা সচেতনতা বাড়াচ্ছে।
তবে, গ্রামীণ এলাকায় এই রোগ সম্পর্কে তথ্য প্রায় নেই। এই সমস্যা মোকাবিলায়, বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস সোসাইটি (BMSS) স্কুল ও কলেজে শিক্ষামূলক সেমিনার শুরু করেছে, যেখানে ২০২৪ সালে ৫,০০০ তরুণীকে এন্ডোমেট্রিওসিস সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রযুক্তিও এই লড়াইয়ে সহায়তা করছে। কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজে AI-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক টুল চালু হয়েছে, যা লক্ষণ বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক নির্ণয়ে সহায়তা করে এবং নির্ণয়ের সময় ৩০% কমিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসকদের জন্য আরও প্রশিক্ষণ, সাশ্রয়ী ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এই দেরি কমাতে পারে। সরকার ২০২৬ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় এন্ডোমেট্রিওসিসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা নারীদের জন্য নতুন আশা বয়ে আনছে।
