x
d o c t o r s 2 4
এহলারস-ড্যানলোস সিন্ড্রোম কী? এর ১ বছর আগে প্রকাশ পায় যে লক্ষণ
08 Feb

এহলারস-ড্যানলোস সিন্ড্রোম (Ehlers-Danlos Syndrome বা EDS) হলো একদল বংশগত ব্যাধি যা আমাদের শরীরের কানেক্টিভ টিস্যু বা সংযোজক কলাকে আক্রমণ করে। আমাদের ত্বক, জয়েন্ট এবং রক্তনালীর দেয়াল মজবুত রাখার জন্য দায়ী ‘কোলাজেন’ প্রোটিনের ত্রুটির কারণে এই সমস্যা হয়।

এই সিন্ড্রোমটি অনেক সময় হঠাৎ করে ধরা পড়ে না। চিকিৎসকদের মতে, শরীরের অভ্যন্তরীণ জটিলতা বা জয়েন্টের বড় কোনো ইনজুরি হওয়ার অন্তত ১ বছর আগে থেকে শরীর ৭টি বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো চিনতে পারলে ভবিষ্যৎ পঙ্গুত্ব বা রক্তনালী ফেটে যাওয়ার মতো ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

EDS-এর পূর্ণাঙ্গ লক্ষণগুলো প্রকট হওয়ার ১ বছর আগে থেকেই নিম্নলিখিত পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়:

১. জয়েন্টের অস্বাভাবিক নমনীয়তা (Hypermobility):

আপনি যদি দেখেন আপনার আঙুল, কবজি বা হাঁটু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বাঁকানো যাচ্ছে (যেমন—বৃদ্ধাঙ্গুলি কবজির সাথে ঠেকানো), তবে এটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ। ১ বছর আগে থেকেই জয়েন্টগুলো ঢিলেঢালা মনে হতে পারে এবং খুব সহজেই মচকে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

২. ত্বকের অদ্ভুত স্থিতিস্থাপকতা (Skin Hyperextensibility):

আপনার হাতের বা গলার চামড়া যদি চিমটি দিয়ে টানলে রাবারের মতো অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয় এবং ছেড়ে দিলে আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়, তবে এটি কোলাজেন ত্রুটির স্পষ্ট সংকেত। এই লক্ষণটি চূড়ান্ত রোগ নির্ণয়ের অনেক আগে থেকেই উপস্থিত থাকে।

৩. সামান্য আঘাতেই কালশিটে পড়া (Easy Bruising):

কোথাও জোরে ধাক্কা লাগেনি, তবুও শরীরে নীল বা কালো দাগ বা কালশিটে পড়ছে? ১ বছর আগে থেকেই রক্তনালীর দেয়াল দুর্বল হতে শুরু করার ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোনো কারণ ছাড়াই কালশিটে দেখা দিতে পারে।

৪. ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগা:

শরীরের কোনো স্থানে কেটে গেলে যদি দেখা যায় তা শুকাতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে এবং শুকানোর পর সেখানে পাতলা ও অদ্ভুত দাগ (Paper-like scar) তৈরি হচ্ছে, তবে বুঝতে হবে আপনার শরীরের কানেক্টিভ টিস্যু পুনর্গঠিত হতে পারছে না।

৫. ক্রনিক ক্লান্তি ও অনিদ্রা:

শরীরের জয়েন্টগুলো ঢিলেঢালা হওয়ার কারণে পেশীগুলোকে হাড় ধরে রাখতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এর ফলে ১ বছর আগে থেকেই ব্যক্তি সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভব করেন এবং রাতে পেশীর ব্যথার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।

৬. দাঁতের মাড়িতে রক্তক্ষরণ ও সমস্যা:

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ইডিএস (EDS)-এর প্রভাব দাঁতের মাড়িতেও পড়ে। ১ বছর আগে থেকেই ব্রাশ করার সময় মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া বা দাঁত আলগা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি হতে পারে। কোলাজেনের অভাবে মাড়ির টিস্যুগুলো দাঁতকে শক্ত করে ধরে রাখতে পারে না।

৭. পেশীর অনবরত কাঁপুনি বা খিঁচুনি (Muscle Spasms):

জয়েন্টের অস্থিরতা ঢাকতে গিয়ে শরীরের পেশীগুলো সবসময় টানটান অবস্থায় থাকে। এর ফলে হঠাৎ করে হাত-পায়ের পেশী লাফানো বা খিঁচুনি হওয়ার মতো লক্ষণ ১ বছর আগে থেকেই নিয়মিত দেখা দেয়।

ব্রেইন ফগ ও অটোনোমিক ডিসফাংশন

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এহলারস-ড্যানলোস সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রোগটি সম্পূর্ণ প্রকাশের আগে ‘ব্রেইন ফগ’ বা মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এর সাথে যুক্ত থাকে POTS (Postural Orthostatic Tachycardia Syndrome), যেখানে বসা থেকে হঠাৎ দাঁড়ালে হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে যায়। এই তথ্যটি সাধারণ মানুষের কাছে এখনও খুব একটা পরিচিত নয়।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

যেহেতু এটি জেনেটিক সমস্যা, তাই এটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনায় সুস্থ থাকা সম্ভব:

  • ফিজিওথেরাপি: পেশী শক্তিশালী করার জন্য বিশেষ ব্যায়াম, যা জয়েন্টগুলোকে সাপোর্ট দেবে।

  • সঠিক পুষ্টি: কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করতে ভিটামিন সি এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ।

  • ভারী কাজ বর্জন: জয়েন্টের ওপর চাপ পড়ে এমন ভারী ওজন তোলা বা কন্টাক্ট স্পোর্টস থেকে দূরে থাকা।

অতিরিক্ত নমনীয় শরীরকে আমরা অনেক সময় ‘গড গিফটেড’ বা ইতিবাচক মনে করি, কিন্তু এটি যদি ব্যথার কারণ হয় তবে তা এহলারস-ড্যানলোস সিন্ড্রোম সংকেত হতে পারে।

Leave A Comment