অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা ও-সি-ডি (OCD) কোনো সাধারণ স্বভাব বা নিছক খুঁতখুঁতেমি নয়। এটি একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যা একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে দিতে পারে। আমাদের সমাজে অনেকেই বার বার হাত ধোয়া বা গোসল করাকে কেবল পরিচ্ছন্নতা মনে করেন, কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে থাকা অসহায়ত্ব ও মানসিক যন্ত্রণার খবর খুব কম মানুষই রাখেন।
বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই ব্যাধিতে আক্রান্ত, অথচ সচেতনতার অভাবে অনেকেই সঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছান না।
ও-সি-ডি মূলত দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত: ‘অবসেশন’ (Obsession) বা আচ্ছন্নকারী চিন্তা এবং ‘কম্পালশন’ (Compulsion) বা বাধ্যতামূলক কাজ। যখন এই দুটি বিষয় কারো নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখনই তাকে মানসিক রোগ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ও-সি-ডি-র লক্ষণ ও ধরন:
ও-সি-ডি কেবল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেতে পারে:
-
সংক্রমণের ভয়: বারবার মনে হওয়া যে হাত বা শরীর অপবিত্র হয়ে আছে, ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত ধোয়া বা গোসল করা।
-
পরীক্ষা করার প্রবণতা: ঘর থেকে বের হওয়ার পর বারবার মনে হওয়া যে দরজার তালা লাগানো হয়েছে কি না, বা গ্যাসের চুলা নেভানো হয়েছে কি না। এটি পরীক্ষা করতে গিয়ে অনেকে বারবার বাড়ি ফিরে আসেন।
-
সমতা ও শৃঙ্খলা (Symmetry): ঘরের আসবাবপত্র বা টেবিলের কলমগুলো একদম নির্দিষ্ট ছকে সাজানো থাকতে হবে। একটু এদিক-সেদিক হলে প্রচণ্ড অস্থিরতা বোধ করা।
-
অপ্রীতিকর চিন্তা: নিজের অজান্তেই মনে অত্যন্ত নেতিবাচক বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন চিন্তা আসা, যা রোগী নিজে চান না কিন্তু মন থেকে সরাতেও পারেন না।
‘নিউরো-সার্কিট’ ও ও-সি-ডি
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ও-সি-ডি কেবল মনের ভুল নয়, বরং মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনের সাথেও যুক্ত। মস্তিষ্কের ‘অরবিটোফ্রন্টাল কর্টেক্স’ এবং ‘স্ট্রিয়াটাম’ নামক অংশের মধ্যে যোগাযোগের অসামঞ্জস্যতার কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়। এছাড়া রক্তে ‘সেরোটোনিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটারের অভাব ও-সি-ডি-র জন্য দায়ী হতে পারে। নতুন একটি তথ্য হলো, শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিশেষ কিছু ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের (PANDAS) পর হঠাৎ করে ও-সি-ডি-র লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
কার্যকর থেরাপি ও প্রতিকার
ও-সি-ডি থেকে মুক্তির জন্য এখন অত্যন্ত আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি উপলব্ধ রয়েছে:
১. ইআরপি থেরাপি (ERP – Exposure and Response Prevention): এটি ও-সি-ডি-র জন্য সবচেয়ে কার্যকর থেরাপি। এখানে রোগীকে পরিকল্পিতভাবে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হয় যা তাকে আতঙ্কিত করে (যেমন- নোংরা কিছু ধরা), কিন্তু তাকে তার বাধ্যতামূলক কাজটি (যেমন- হাত ধোয়া) করতে বাধা দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক বুঝতে শেখে যে হাত না ধুইলেও কোনো বিপদ ঘটবে না।
২. কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT): এটি নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে ইতিবাচক ও যৌক্তিক চিন্তায় রূপান্তর করতে সাহায্য করে।
৩. ওষুধ (Medication): অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা এসএসআরআই (SSRI) জাতীয় ওষুধ দেন যা মস্তিষ্কের সেরোটোনিনের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
৪. আধুনিক প্রযুক্তি (TMS): যাদের ক্ষেত্রে ওষুধ বা থেরাপি কাজ করে না, তাদের জন্য বর্তমানে ‘ট্রান্সক্র্যানিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন’ বা টি-এম-এস অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফলাফল দিচ্ছে।
ও-সি-ডি আক্রান্ত রোগীকে কখনোই পাগল বলা বা তাকে নিয়ে উপহাস করা উচিত নয়। তাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, রোগী ইচ্ছা করে এই কাজগুলো করেন না। তাকে ধমক না দিয়ে বরং থেরাপিস্টের কাছে যেতে উৎসাহ দেওয়া উচিত।
