কানের ব্যথা কেবল যন্ত্রণাদায়ক নয়, এটি অনেক সময় স্থায়ী শ্রবণশক্তি হ্রাসের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। মধ্যকর্ণের এই সংক্রমণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ওটিটিস মিডিয়া (Otitis Media)।
ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে শিশুদের মধ্যে জ্বর ও সর্দি-কাশির সাথে যে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি দেখা দিচ্ছে, তা হলো কানের সংক্রমণ বা ওটিটিস মিডিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩ বছর বয়স হওয়ার আগেই প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু অন্তত একবার এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের কানের গঠনগত পার্থক্যের কারণে তারা বড়দের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করালে এটি কানের পর্দা ছিদ্র হওয়া বা মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ওটিটিস মিডিয়া কেন হয়?
আমাদের কানের পর্দার পেছনের অংশটি (মধ্যকর্ণ) সাধারণত বায়ুপূর্ণ থাকে। নাকের পেছনের অংশের সাথে কানের একটি সরু নালী থাকে যাকে ইউস্টেশিয়ান টিউব বলা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই নালীটি ছোট এবং সোজা থাকে। সর্দি বা অ্যালার্জির কারণে যখন এই নালী বন্ধ হয়ে যায়, তখন মধ্যকর্ণে তরল জমা হয় এবং সেখানে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে সংক্রমণ ঘটায়।
শিশুদের মধ্যে প্রধান লক্ষণসমূহ
ছোট শিশুরা অনেক সময় কানে ব্যথার কথা মুখে বলতে পারে না। সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের নিচের লক্ষণগুলো খেয়াল করতে হবে:
-
কান টানা বা ঘষা: শিশু বারবার হাত দিয়ে কান টানলে বা কান বালিশে ঘষলে বুঝতে হবে কানে অস্বস্তি হচ্ছে।
-
অতিরিক্ত কান্না ও খিটখিটে মেজাজ: বিশেষ করে শুয়ে থাকার সময় কানের চাপ বেড়ে যায়, ফলে শিশু রাতে বেশি কান্নাকাটি করে।
-
জ্বর ও শ্রবণে সমস্যা: শিশুর জ্বর আসা এবং ডাকলে সাড়া না দেওয়া বা টিভির ভলিউম বাড়িয়ে দেওয়া।
-
কান দিয়ে তরল নির্গত হওয়া: কান থেকে হলুদ বা সাদাটে পুঁজ বা রক্ত মিশ্রিত জল বের হওয়া।
-
ভারসাম্য হারানো: কানের সংক্রমণের কারণে শিশুর হাঁটতে বা ব্যালেন্স রাখতে সমস্যা হতে পারে।
‘সেকেন্ড হ্যান্ড স্মোক’ ও স্মার্টফোন ব্যবহারের ঝুঁকি
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বাড়িতে বড়রা ধূমপান করেন, সেই বাড়ির শিশুদের ওটিটিস মিডিয়ার ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। তামাকের ধোঁয়া ইউস্টেশিয়ান টিউবের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। এছাড়া, নতুন একটি উদ্বেগের বিষয় হলো—অতিরিক্ত স্মার্টফোন বা হেডফোন ব্যবহার। দীর্ঘক্ষণ কানে হেডফোন লাগিয়ে রাখা বা কান পরিষ্কার করার জন্য কটন বাড ব্যবহার করা কানের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর নষ্ট করে সংক্রমণকে ত্বরান্বিত করছে।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
ওটিটিস মিডিয়ার চিকিৎসা সংক্রমণের ধরণের ওপর নির্ভর করে:
-
অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ: অনেক সময় ভাইরাসজনিত সংক্রমণ এমনিতেই সেরে যায়। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ২-৩ দিন পর্যবেক্ষণ করেন।
-
অ্যান্টিবায়োটিক: যদি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ নিশ্চিত হয়, তবে পূর্ণ মেয়াদে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে সংক্রমণ পুনরায় ফিরে আসতে পারে।
-
পেইন রিলিফ: কানের ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল বা ইবুপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়।
-
সার্জারি (Myringotomy): যদি কানে বারবার জল জমে বা ওষুধে কাজ না হয়, তবে কানের পর্দায় ছোট ছিদ্র করে একটি টিউব (Grommet) বসানো হয় যাতে তরল বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রতিরোধে অভিভাবকদের করণীয়
১. সঠিকভাবে দুধ খাওয়ানো: শিশুকে শুইয়ে দুধ খাওয়াবেন না। মাথা কিছুটা উঁচুতে রেখে দুধ খাওয়ালে তরল কানে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
২. টিকা নিশ্চিত করা: নিউমোকোকাল এবং ফ্লু ভ্যাকসিন শিশুদের কানের সংক্রমণ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
৩. পরিচ্ছন্নতা: শিশুকে ধোঁয়া এবং ধুলোবালি থেকে দূরে রাখুন। নিজের এবং শিশুর হাত নিয়মিত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
৪. কটন বাড বর্জন: কানের ভেতরে কটন বাড বা কাঠি ঢোকাবেন না, এটি সংক্রমণ আরও গভীরে ঠেলে দেয়।
বিশেষ তথ্য: মনে রাখবেন, শিশুদের কানের সংক্রমণ অনেক সময় ভাষা শেখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যদি দীর্ঘ সময় কানে জল জমে থাকে, তবে শিশু কথা শুনতে পায় না এবং তার কথা বলা শিখতে দেরি হয় (Speech Delay)।
