ক্যালসিয়ামকে সাধারণত শুধু হাড় ও দাঁতের পুষ্টি হিসেবেই দেখা হয়, কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে এই খনিজটির ভূমিকা আরও বহুমাত্রিক। হাড় মজবুত রাখা ছাড়াও ক্যালসিয়াম স্নায়ুর সংকেত আদান–প্রদান, পেশির সংকোচন, হৃদস্পন্দনের ছন্দ এবং হরমোন নিঃসরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবুও অনেকেই মনে করেন, ক্যালসিয়াম মানেই শুধু দুধ। বাস্তবে খাদ্যে ক্যালসিয়ামের উৎস অনেক বিস্তৃত, যেখানে দুগ্ধজাতের পাশাপাশি নন-দুগ্ধ উৎসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুগ্ধজাত উৎস: পরিচিত কিন্তু সবসময় উপযোগী নয়
দুধ, দই, পনির ও চিজ ক্যালসিয়ামের সবচেয়ে পরিচিত উৎস। এগুলোতে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ভিটামিন ডি ও প্রোটিন থাকায় শরীরে শোষণ তুলনামূলক ভালো হয়। এক গ্লাস দুধে দৈনিক প্রয়োজনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। তবে নতুন তথ্য অনুযায়ী, ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা ফুড সেন্সিটিভিটি থাকা মানুষের ক্ষেত্রে দুগ্ধজাত খাবার হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত দুগ্ধজাত খাবার কিছু মানুষের মধ্যে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা ত্বকের সমস্যাও বাড়াতে পারে।
নন-দুগ্ধ উৎস: অবহেলিত কিন্তু কার্যকর
সাম্প্রতিক পুষ্টি গবেষণায় নন-দুগ্ধ ক্যালসিয়াম উৎসের গুরুত্ব বাড়ছে। শাকসবজির মধ্যে কলমি শাক, পালং শাক, ব্রকলি, লাল শাক ও কেল-এ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। বিশেষ করে কেল ও ব্রকলির ক্যালসিয়াম শরীরে তুলনামূলক ভালোভাবে শোষিত হয়। তিল, বাদাম, কাজুবাদাম ও চিনাবাদামেও ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট সরবরাহ করে।
নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে শস্য ও ডালজাত খাবারও ক্যালসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ছোলা, মসুর ডাল ও সয়াবিনে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি উদ্ভিজ্জ প্রোটিন পাওয়া যায়। এছাড়া বর্তমানে বাজারে ক্যালসিয়াম-ফর্টিফায়েড উদ্ভিজ্জ দুধ যেমন সয়া মিল্ক, বাদাম দুধ বা ওট মিল্ক সহজলভ্য হচ্ছে, যা দুগ্ধজাতের বিকল্প হিসেবে কার্যকর।
শোষণের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
সব ক্যালসিয়ামই সমানভাবে শরীরে শোষিত হয় না—এটি নতুন গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অক্সালেট ও ফাইটেটসমৃদ্ধ কিছু খাবার ক্যালসিয়াম শোষণ কমাতে পারে। যেমন, পালং শাকে ক্যালসিয়াম থাকলেও অক্সালেটের কারণে এর শোষণ সীমিত। অন্যদিকে কেল বা ব্রকলিতে অক্সালেট কম থাকায় সেগুলোর ক্যালসিয়াম বেশি কার্যকর। ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণে বড় ভূমিকা রাখে, তাই রোদে থাকা বা ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ জরুরি।
বয়স ও জীবনধারাভেদে চাহিদা
বয়সভেদে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন ভিন্ন হয়। শিশু ও কিশোর বয়সে হাড় গঠনের জন্য বেশি ক্যালসিয়াম দরকার হয়, আবার মধ্যবয়সের পর হাড় ক্ষয় রোধে এর গুরুত্ব বাড়ে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের ক্যালসিয়াম ঘাটতির ঝুঁকি বেশি, তাই তাদের খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্যময় ক্যালসিয়াম উৎস থাকা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত গ্রহণের ঝুঁকি
ক্যালসিয়াম যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি অতিরিক্ত গ্রহণও ক্ষতিকর হতে পারে। সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, সম্ভব হলে খাদ্য থেকেই ক্যালসিয়াম নেওয়া ভালো।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্যালসিয়াম শুধু দুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুগ্ধজাত ও নন-দুগ্ধ—উভয় উৎসের সঠিক সমন্বয় শরীরকে প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম সরবরাহ করতে পারে। সচেতন খাদ্য নির্বাচনই হাড় ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার চাবিকাঠি।
