ক্রিপটর্কিডিজম (Cryptorchidism) বা ‘অণ্ডকোষ নিচে না নামা’ একটি জন্মগত সমস্যা, যেখানে একটি বা উভয় অণ্ডকোষ শিশুর অণ্ডথলিতে (Scrotum) পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষ দিকে অণ্ডকোষ পেট থেকে নেমে অণ্ডথলিতে আসে। তবে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়।
যদিও এটি জন্মের পরেই দৃশ্যমান হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে ধরা পড়ার বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার অন্তত ১ বছর আগে থেকেই শরীরের ভেতরে এবং বাইরে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই লক্ষণগুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারলে অকাল বন্ধ্যাত্ব বা অণ্ডকোষের ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
ক্রিপটর্কিডিজম যখন স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়, তার ১ বছর আগে থেকেই নিম্নলিখিত ৪টি সংকেত পাওয়া যায়:
১. অণ্ডথলিতে শূন্যতা বা অসামঞ্জস্যতা:
১ বছর আগে থেকেই লক্ষ্য করলে দেখা যায়, শিশুর অণ্ডথলিটি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট বা কুঁচকানো। যদি হাত দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, তবে থলির ভেতরে অণ্ডকোষের উপস্থিতি অনুভব করা যায় না। অনেক সময় এক পাশের থলি ভরাট থাকলেও অন্য পাশটি সম্পূর্ণ খালি মনে হয়।
২. অস্থায়ী উপস্থিতি বা ‘রিট্র্যাকটাইল’ অণ্ডকোষ:
এটি একটি বিভ্রান্তিকর লক্ষণ। ১ বছর আগে থেকেই দেখা যায়, অণ্ডকোষটি মাঝেমধ্যে থলিতে নেমে আসে আবার পরক্ষণেই পেটের দিকে বা কুঁচকির (Groin) দিকে উঠে যায়। বিশেষ করে শিশু যখন ঠান্ডা অনুভব করে বা ভয় পায়, তখন এটি উপরে উঠে যায়। এটি নির্দেশ করে যে অণ্ডকোষটি নিচে ধরে রাখার পেশীগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
৩. কুঁচকির অংশে অস্বাভাবিক ফোলা ভাব (Groin Lump):
যেহেতু অণ্ডকোষটি থলিতে নামতে পারেনি, সেটি কুঁচকি বা পেটের নিচের দিকের নালীতে (Inguinal Canal) আটকে থাকতে পারে। ১ বছর আগে থেকেই ওই নির্দিষ্ট স্থানে একটি ছোট নরম পিণ্ড বা ফোলা ভাব নজরে আসতে পারে। শিশুর কান্নার সময় বা ভারী কিছু তোলার সময় এই ফোলা ভাব আরও স্পষ্ট হয়।
৪. কুঁচকি বা তলপেটে মাঝে মাঝে অস্বস্তি:
শিশু যদি একটু বড় হয়, তবে সে ওই স্থানে হালকা ব্যথা বা অস্বস্তির কথা বলতে পারে। অণ্ডকোষটি ভুল জায়গায় থাকার ফলে আশেপাশের স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে, যা ১ বছর আগে থেকেই অনিয়মিত ব্যথার সৃষ্টি করে। অনেক সময় এটি হার্নিয়ার লক্ষণের সাথেও মিলে যেতে পারে।
হরমোন এবং পরিবেশগত প্রভাব
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রিপটর্কিডিজম কেবল শারীরিক গঠনগত ত্রুটি নয়। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল (EDC) যেমন—প্লাস্টিকের বিপিএ (BPA) বা কসমেটিকসের কেমিক্যাল যদি বেশি প্রবেশ করে, তবে তা শিশুর টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রবাহে বাধা দেয়। এই হরমোনের ঘাটতিই অণ্ডকোষ নিচে নামার প্রক্রিয়াকে ১ বছর আগেই ধীর করে দেয়।
কেন চিকিৎসা জরুরি?
অণ্ডকোষের সঠিক বিকাশের জন্য শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ২-৩ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা প্রয়োজন, যা কেবল অণ্ডথলিতেই সম্ভব। পেটের ভেতরে অতিরিক্ত গরমে অণ্ডকোষ থাকলে:
-
ভবিষ্যতে শুক্রাণু তৈরির ক্ষমতা হারিয়ে যেতে পারে (বন্ধ্যাত্ব)।
-
অণ্ডকোষের ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
-
‘টেস্টিকুলার টরশন’ বা অণ্ডকোষ পেঁচিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি
যদি শিশুর ১ বছর বয়সের মধ্যেও অণ্ডকোষ নিচে না নামে, তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সাধারণত অরকিওপেক্সি (Orchiopexy) নামক একটি ছোট অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। এটি ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে করা হয় এবং এর মাধ্যমে অণ্ডকোষটিকে টেনে থলিতে এনে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়।
ক্রিপটর্কিডিজম কোনো লজ্জা বা ভয়ের বিষয় নয়। ১ বছর আগে থেকে শিশুর শারীরিক পরিবর্তনের দিকে নজর দিলে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
