x
d o c t o r s 2 4
09 Oct

ক্রিসপার (CRISPR-Cas9) জিন এডিটিং প্রযুক্তি চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই প্রযুক্তি ডিএনএ’র নির্দিষ্ট অংশ কেটে, সংশোধন বা প্রতিস্থাপন করে জিনগত রোগের চিকিৎসায় নতুন দ্বার উন্মোচন করছে। বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, সিকল সেল অ্যানিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া এবং ক্যান্সারের মতো জিনগত রোগের চিকিৎসায় এটি বিশাল সম্ভাবনা রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, ক্রিসপার ২০৩০ সালের মধ্যে জিনগত রোগের চিকিৎসায় মূলধারায় পরিণত হতে পারে।

ক্রিসপার (Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats) একটি জিন এডিটিং টুল, যা ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত। এটি একটি “আণবিক কাঁচি” হিসেবে কাজ করে, যা ডিএনএ’র নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে কাটে এবং ত্রুটিপূর্ণ জিন সংশোধন বা প্রতিস্থাপন করে। এই প্রযুক্তি ২০১২ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং ২০২০ সালে এর জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। বাংলাদেশে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ক্রিসপার নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা শুরু হয়েছে।

জিনগত রোগে ক্রিসপারের ভূমিকা

ক্রিসপার জিনগত রোগের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে:

সিকল সেল অ্যানিমিয়া: এই রোগে ত্রুটিপূর্ণ জিন রক্তকণিকার গঠন বিকৃত করে। ক্রিসপার ব্যবহার করে ত্রুটিপূর্ণ জিন সংশোধন করা সম্ভব। ২০২৪ সালে একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিকাল ট্রায়ালে ৭০% রোগী ক্রিসপার চিকিৎসায় উপকৃত হয়েছেন।

থ্যালাসেমিয়া: বাংলাদেশে প্রায় ৭% মানুষ থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার। ক্রিসপার দিয়ে রক্ত উৎপাদনের জিন সংশোধন করে রোগীদের রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা কমানো যায়। বিএসএমএমইউ’র গবেষণায় এই প্রযুক্তি নিয়ে পাইলট প্রকল্প চলছে।

ক্যান্সার: ক্রিসপার ইমিউন কোষ (টি-সেল) পরিবর্তন করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম। চট্টগ্রামের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এটি লিউকেমিয়ার চিকিৎসায় ৫০% কার্যকর।

অন্যান্য রোগ: হান্টিংটন রোগ, সিস্টিক ফাইব্রোসিস এবং পেশীবিকারের মতো রোগের চিকিৎসায় ক্রিসপার প্রতিশ্রুতিশীল।

বাংলাদেশে সম্ভাবনা

বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া এবং সিকল সেল অ্যানিমিয়ার মতো জিনগত রোগের প্রকোপ উচ্চ। প্রতি বছর প্রায় ১০,০০০ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মায়। ক্রিসপার এই রোগীদের জন্য স্থায়ী সমাধান দিতে পারে। ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বায়োটেকনোলজি (এনআইবি) ২০২৬ সালের মধ্যে ক্রিসপার-ভিত্তিক চিকিৎসা ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতায় বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা জিন এডিটিং নিয়ে কাজ করছেন।

চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে ক্রিসপার প্রযুক্তি প্রয়োগে বেশ কিছু বাধা রয়েছে:

উচ্চ ব্যয়: ক্রিসপার চিকিৎসার খরচ বর্তমানে লাখ লাখ টাকা, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

প্রশিক্ষিত জনবল: জিন এডিটিংয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকের অভাব।

নৈতিক উদ্বেগ: জিন পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

জনসচেতনতা: গ্রামীণ এলাকায় জিন এডিটিং সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং সচেতনতার অভাব।

বিশ্বব্যাপী ক্রিসপার গবেষণা দ্রুত এগিয়ে চলছে। ২০২৫ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে সিকল সেল অ্যানিমিয়ার জন্য ক্রিসপার-ভিত্তিক চিকিৎসা বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ক্রিসপার গবেষণার জন্য তহবিল বাড়ছে।

Leave A Comment