ক্রোমিয়াম—একটি সাধারণ খনিজ উপাদান যা আমাদের শরীরে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। এটি ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) অনুমান অনুসারে, বিশ্বে ৪২২ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, এবং বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রায় ৮.৪ মিলিয়ন।
এই পরিসংখ্যানের মাঝে ক্রোমিয়ামের ভূমিকা নিয়ে নতুন গবেষণা আলোকপাত করছে, যা ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও চিকিত্সায় বিপ্লব ঘটাতে পারে।
ক্রোমিয়াম প্রধানত ট্রাইভ্যালেন্ট ফর্মে (Cr³⁺) শরীরে কাজ করে, যা গ্লুকোজ টলারেন্স ফ্যাক্টর (GTF) নামক যৌগের সাথে যুক্ত। এটি ইনসুলিন রিসেপ্টরগুলোকে সক্রিয় করে, ফলে কোষগুলো গ্লুকোজ গ্রহণ করে সহজে।
২০২৪ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে (Journal of Trace Elements in Medicine and Biology) দেখা গেছে, ক্রোমিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারী টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ফাস্টিং ব্লাড গ্লুকোজ ১৫-২০% কমে যায়। এছাড়া, HbA1c লেভেলে ০.৬-১.০% হ্রাস পায়, যা দীর্ঘমেয়াদি শর্করা নিয়ন্ত্রণের সূচক।
সাম্প্রতিককালে ক্রোমিয়ামের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও গভীর হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা (Nutrients জার্নাল) দেখিয়েছে যে, ক্রোমিয়াম পিকোলিনেট—একটি জৈব-উপলভ্য ফর্ম—প্রতিদিন ২০০-১০০০ মাইক্রোগ্রাম ডোজে ১২ সপ্তাহ গ্রহণ করলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ২৫% পর্যন্ত কমায়।
এই গবেষণায় ৫০০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী ছিল, যাদের মধ্যে প্রিডায়াবেটিক রোগীরা উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখিয়েছেন। আরেকটি নতুন তথ্য হলো, ক্রোমিয়ামের অভাব শুধু ডায়াবেটিস নয়, পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS) রোগীদের মধ্যেও শর্করা অস্থিরতা বাড়ায়। American Journal of Clinical Nutrition-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুসারে, PCOS আক্রান্ত নারীদের ক্রোমিয়াম সাপ্লিমেন্ট দিলে ওভারিয়ান ফাংশন উন্নত হয় এবং ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ে ১৮%।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রসারের কারণে ক্রোমিয়ামের অভাব বাড়ছে। ICDDR,B-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ৩৫% প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তে ক্রোমিয়ামের মাত্রা স্বাভাবিকের নীচে (০.১-০.৫ μg/L)। এর ফলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে ১.৫ গুণ।
প্রাকৃতিকভাবে ক্রোমিয়াম পাওয়া যায় ব্রকোলি (১ কাপে ২২ μg), আখরোট, ওটস, মাশরুম, লিভার এবং পুরো শস্যে। USDA-এর ডেটা অনুসারে, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক চাহিদা ২৫-৩৫ μg। তবে আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে এটি পূরণ হয় না। সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ক্রোমিয়াম পিকোলিনেট বা ক্রোমিয়াম পলিনিকোটিনেট নিরাপদ, কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ১০০০ μg-এর বেশি গ্রহণ করবেন না। অতিরিক্ত ডোজে কিডনি বা লিভারের সমস্যা হতে পারে।
