গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে নানা হরমোনগত ও শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের মাঝেই অনেক সময় নীরবে বাসা বাঁধে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus – GDM)। সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪–২৮ সপ্তাহে রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে এটি ধরা পড়ে। তবে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা বলছে, রোগটি শনাক্ত হওয়ার প্রায় ৩ মাস আগেই শরীরে কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেগুলো অনেক নারীই গুরুত্ব দেন না। সময়মতো এই লক্ষণগুলো চিনতে পারলে মা ও শিশুর জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
প্রথম লক্ষণটি হলো অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত তৃষ্ণা। গর্ভাবস্থায় পানি খাওয়ার চাহিদা কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক, কিন্তু যদি বারবার মুখ শুকিয়ে আসে, প্রচুর পানি খেয়েও তৃষ্ণা না মেটে এবং রাতে ঘুম ভেঙে পানি খেতে হয়—তবে তা হতে পারে রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার প্রাথমিক ইঙ্গিত। হরমোনের প্রভাবে ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করতে চায়, ফলে পানিশূন্যতা তৈরি হয়।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো বারবার প্রস্রাবের চাপ, বিশেষ করে রাতে। গর্ভাবস্থায় জরায়ু বড় হওয়ায় প্রস্রাবের চাপ কিছুটা বাড়ে ঠিকই, কিন্তু জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের পরিমাণ ও次数 অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অনেক সময় প্রস্রাবের সঙ্গে হালকা জ্বালাপোড়া বা ক্লান্তিও অনুভূত হয়। এটি মূলত কিডনি অতিরিক্ত গ্লুকোজ বের করে দেওয়ার চেষ্টা করার ফল।
তৃতীয় লক্ষণটি বেশিরভাগ সময় উপেক্ষিত থাকে—অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা। গর্ভাবস্থায় ক্লান্তি স্বাভাবিক হলেও যদি বিশ্রামের পরও শক্তি ফিরে না আসে, হালকা কাজেই হাঁপিয়ে পড়তে হয় বা মাথা ঝিমঝিম করে, তাহলে সেটি রক্তে শর্করার ওঠানামার সংকেত হতে পারে। পর্যাপ্ত গ্লুকোজ কোষে ঢুকতে না পারলে শরীর শক্তি উৎপাদনে ব্যর্থ হয়, ফলে এমন ক্লান্তি দেখা দেয়।
চতুর্থ লক্ষণ হলো হঠাৎ ও অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি, বিশেষ করে পেট ও কোমরের চারপাশে। গর্ভাবস্থায় ওজন বাড়বেই, তবে যদি খুব অল্প সময়ে ওজন দ্রুত বেড়ে যায় এবং ডাক্তার নির্ধারিত স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে তা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের আগাম সতর্কতা হতে পারে। অতিরিক্ত শর্করা শরীরে ফ্যাট হিসেবে জমতে শুরু করলে এই সমস্যা দেখা দেয়।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীর পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে, যাদের আগে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) ছিল, অথবা যাদের গর্ভধারণের আগে ওজন বেশি ছিল—তাদের ক্ষেত্রে এই আগাম লক্ষণগুলো আরও স্পষ্টভাবে দেখা দিতে পারে। এছাড়া আধুনিক চিকিৎসায় এখন প্রথম ত্রৈমাসিক থেকেই HbA1c ও ফাস্টিং গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের জন্য, যা আগে তেমন প্রচলিত ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি বা একাধিক দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, হালকা ব্যায়াম ও প্রয়োজনে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এতে মায়ের পাশাপাশি অনাগত শিশুর অতিরিক্ত ওজন, প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি ও ভবিষ্যতের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
