টিনিটাস, যা কানে শব্দ বা কান বাজা নামে পরিচিত, এমন একটি অবস্থা যেখানে ব্যক্তি কোনো বাহ্যিক উৎস ছাড়াই কানে ঝিঁঝিঁ শব্দ, গুঞ্জন, বা হিসহিস শব্দ শুনতে পান। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫-২০% মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন, এবং বাংলাদেশেও এর প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। এই অবস্থা কখনো কখনো এতটাই তীব্র হয় যে ঘুম, মনোযোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালে টিনিটাসের কারণ ও মোকাবিলার জন্য নতুন গবেষণা এবং চিকিৎসা পদ্ধতি আশার আলো দেখাচ্ছে।
টিনিটাস কোনো রোগ নয়, বরং বিভিন্ন শারীরিক বা পরিবেশগত কারণের উপসর্গ। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- শ্রবণশক্তির ক্ষতি: বয়সজনিত শ্রবণ হ্রাস বা উচ্চ শব্দের সংস্পর্শে থাকা টিনিটাসের অন্যতম কারণ।
- কানের সংক্রমণ বা আঘাত: কানের পর্দার ক্ষতি বা মধ্যকর্ণের সমস্যা এই অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।
- মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: স্ট্রেস টিনিটাসের তীব্রতা বাড়াতে পারে।
- ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু ওষুধ, যেমন অ্যাসপিরিন বা নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক, টিনিটাস ট্রিগার করতে পারে।
- স্বাস্থ্য সমস্যা: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বা থাইরয়েডের সমস্যাও এর সঙ্গে যুক্ত।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি স্মার্টফোন বা ইয়ারফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, বিশেষ করে উচ্চ ভলিউমে, তরুণদের মধ্যে টিনিটাসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এছাড়া, মস্তিষ্কের নিউরাল প্যাটার্নে পরিবর্তনের সঙ্গে টিনিটাসের সম্পর্ক নিয়ে নতুন তথ্য উঠে এসেছে, যা চিকিৎসার নতুন দিক উন্মোচন করছে।
টিনিটাসের কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাময় না থাকলেও, এর প্রভাব কমাতে এবং জীবনমান উন্নত করতে বিভিন্ন পদ্ধতি কার্যকর। সাম্প্রতিক অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে:
- কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT): এই থেরাপি রোগীদের টিনিটাসের প্রতি মানসিক প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করতে সাহায্য করে। ২০২৫ সালে, AI-ভিত্তিক CBT অ্যাপগুলো ব্যক্তিগতকৃত মানসিক সহায়তা দিচ্ছে, যা টিনিটাসের কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ কমাতে সহায়ক।
- সাউন্ড থেরাপি: হোয়াইট নয়েজ মেশিন বা মাস্কিং ডিভাইস ব্যবহার করে টিনিটাসের শব্দকে ছাপিয়ে যাওয়া যায়। নতুন প্রযুক্তি হিসেবে, কাস্টমাইজড সাউন্ড ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে মস্তিষ্ককে পুনরায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
- নিউরোমডুলেশন: ২০২৫ সালে, ট্রান্সক্রেনিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (TMS) এবং ভ্যাগাস নার্ভ স্টিমুলেশনের মতো পদ্ধতি টিনিটাসের তীব্রতা কমাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ফল দেখাচ্ছে। এই পদ্ধতিগুলো মস্তিষ্কের শ্রবণ সংক্রান্ত অংশের অতিরিক্ত সক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ করে।
- ঔষধের উন্নতি: নতুন গবেষণায়, নির্দিষ্ট নিউরোট্রান্সমিটার-টার্গেটেড ওষুধ টিনিটাসের উপসর্গ কমাতে কার্যকর হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই ওষুধগুলো এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
- জীবনযাত্রার পরিবর্তন: ধূমপান ত্যাগ, ক্যাফেইন কমানো, এবং কানের সুরক্ষার জন্য ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার টিনিটাস প্রতিরোধে সহায়ক। সাম্প্রতিক গবেষণা পরামর্শ দেয় যে, মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন এবং যোগা টিনিটাসের মানসিক প্রভাব কমাতে পারে।
বাংলাদেশে টিনিটাস নিয়ে সচেতনতা এখনো কম। অনেকে এই অবস্থাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপেক্ষা করেন, যা পরবর্তীতে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, টিনিটাসের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
