রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া বললেই আমরা সাধারণত আয়রনের অভাবকে বুঝি। কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা ‘পার্নিশিয়াস অ্যানিমিয়া’ একটি নীরব ঘাতক, যা সরাসরি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর অন্তত তিন মাস আগে থেকে শরীর চারটি সুনির্দিষ্ট লক্ষণ জানান দেয়।
পার্নিশিয়াস অ্যানিমিয়া মূলত একটি অটো-ইমিউন কন্ডিশন, যেখানে শরীর ভিটামিন বি-১২ (B12) শোষণ করতে ব্যর্থ হয়। আমাদের পাকস্থলীতে ‘ইনট্রিনসিক ফ্যাক্টর’ নামক এক ধরণের প্রোটিনের অভাব ঘটলে শরীর খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় বি-১২ গ্রহণ করতে পারে না। ফলে লোহিত রক্তকণিকা তার স্বাভাবিক আকার হারিয়ে ফেলে এবং শরীরের অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগটি নিঃশব্দে শরীরে বাসা বাঁধে এবং রোগী বোঝার আগেই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে ফেলে।
৩ মাস আগে থেকে প্রকট হওয়া ৪টি প্রধান লক্ষণ
শরীরের ভেতর ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি যখন তীব্র হতে শুরু করে, তখন রোগ নির্ণয়ের অন্তত ৯০ দিন আগে থেকেই নিচের এই পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়:
-
হাত ও পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরা বা সূঁচ ফোটানোর অনুভূতি: এটি পার্নিশিয়াস অ্যানিমিয়ার অন্যতম প্রাথমিক ও প্রধান সংকেত। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্যারেস্থেসিয়া’ বলা হয়। পর্যাপ্ত রক্ত চলাচলের অভাব এবং বি-১২ এর অভাবে স্নায়ুর চারপাশের সুরক্ষামূলক আবরণ বা মায়োলিন শিথল হতে শুরু করলে হাত ও পায়ে অবশ ভাব বা বৈদ্যুতিক শকের মতো অনুভূতি হয়।
-
জিহ্বার মসৃণতা এবং কালশিটে ভাব: আয়রনজনিত অ্যানিমিয়া থেকে এটি আলাদা করার সহজ উপায় হলো জিহ্বা পর্যবেক্ষণ করা। আক্রান্ত ব্যক্তির জিহ্বা অস্বাভাবিক লাল এবং চকচকে বা মসৃণ হয়ে যায়। একে ‘গ্লসাইটিস’ বলা হয়। জিহ্বার ওপরের ছোট দানাদার অংশগুলো (প্যাপিলি) অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় স্বাদ গ্রহণেও সমস্যা দেখা দেয়।
-
মানসিক বিভ্রান্তি ও হঠাৎ ভুলে যাওয়ার প্রবণতা: বি-১২ সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যকারিতার সাথে যুক্ত। এই রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ের তিন মাস আগে থেকেই রোগী কাজে মনোযোগ হারাতে শুরু করেন এবং খুব সাধারণ বিষয় ভুলে যান। একে অনেকেই বার্ধক্যজনিত সমস্যা মনে করলেও এটি আসলে স্নায়বিক অবক্ষয়ের শুরু।
-
অস্থিরতা এবং শ্বাসকষ্টের মৃদু আভাস: কোনো ভারী কাজ ছাড়াই বুক ধড়ফড় করা এবং অল্প হাঁটলে হাঁপিয়ে ওঠা এই রোগের আগাম বার্তা। শরীর যখন সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা পায় না, তখন হৃদপিণ্ডকে অক্সিজেনের অভাব মেটাতে দ্বিগুণ গতিতে কাজ করতে হয়, যা রোগীকে মানসিকভাবেও খিটখিটে করে তোলে।
রোগের গভীরতা ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
পার্নিশিয়াস অ্যানিমিয়া সম্পর্কে জনস্বাস্থ্যের কিছু তথ্য আমাদের চোখ খুলে দেয়:
-
বিপজ্জনক বয়স: সাধারণত ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা বেশি থাকলেও বর্তমানে খাদ্যাভ্যাসের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এটি দেখা যাচ্ছে।
-
শনাক্তকরণ: সাধারণ ব্লাড কাউন্ট (CBC) পরীক্ষায় এটি অনেক সময় ধরা পড়ে না, এর জন্য সুনির্দিষ্ট ভিটামিন বি-১২ এবং ‘প্যারাইটাল সেল অ্যান্টিবডি’ পরীক্ষা প্রয়োজন।
-
ঝুঁকি: নিরামিষভোজী এবং যাদের গ্যাস্ট্রিকের কারণে নিয়মিত এন্টাসিড জাতীয় ওষুধ খেতে হয়, তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
প্রতিকার ও আগামীর ভাবনা
পার্নিশিয়াস অ্যানিমিয়ার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী হলেও এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তবে সচেতনতার অভাবে দেরি হয়ে গেলে স্নায়ুর ক্ষতি পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে এই রোগের জন্য মুখে খাওয়ার ওষুধের চেয়ে ইনজেকশনের মাধ্যমে ভিটামিন বি-১২ গ্রহণকে বেশি কার্যকর মনে করা হয়, কারণ পাকস্থলী এই ভিটামিন শোষণে অক্ষম থাকে।
আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতায় সাধারণত ‘ভিটামিন বি-১২’ অবহেলিত থাকে। কিন্তু পার্নিশিয়াস অ্যানিমিয়ার এই আগাম লক্ষণগুলো চিনতে পারা মানে হলো একটি সম্ভাব্য পঙ্গুত্ব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নেওয়া। শরীর যখন কথা বলে, তখন তা শোনা জরুরি। বিশেষ করে মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের উচিত নিয়মিত বিরতিতে রক্তে ভিটামিনের মাত্রা পরীক্ষা করা। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে রোগ শনাক্তকরণই সুস্থ দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি।
