নারীদের মাসিকচক্রের একটি স্বাভাবিক অংশ হলো প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোম (PMS), যা অনেকেরই মাসিক শুরুর আগে প্রায় এক সপ্তাহ পূর্বে দেখা দেয়। এই সময় শরীরে হরমোনের ওঠানামা ঘটে, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তনের কারণে মনের অবস্থা, ক্ষুধা, ঘুম, এমনকি ত্বকেও প্রভাব পড়ে।
যদিও অনেকেই এই পরিবর্তনকে ‘স্বাভাবিক’ ধরে নেন, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষণগুলো শরীরের অভ্যন্তরীণ বার্তা — যা মাসিক আসন্ন হওয়ার সংকেত দেয়।
নিচে PMS-এর ১ সপ্তাহ আগে সাধারণত যে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ দেখা যায়, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো—
১. মুড সুইং ও মানসিক অস্থিরতা
প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোমের সবচেয়ে প্রচলিত ও লক্ষণীয় দিক হলো মনের অস্থিরতা বা মুড সুইং।
এই সময় নারীদের সেরোটোনিন হরমোনের মাত্রা কমে যায়, যা মস্তিষ্কে “হ্যাপিনেস কেমিক্যাল” নামে পরিচিত। ফলে মন খারাপ, রাগ, হতাশা বা কান্নার প্রবণতা বেড়ে যায়। অনেকেই অল্প কারণে চিৎকার বা বিরক্ত বোধ করেন, যা আসলে হরমোনের ওঠানামারই প্রতিফলন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে প্রায় ৭ জন PMS চলাকালীন মানসিক ওঠানামা অনুভব করেন।
২. খাবারের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ বা ক্ষুধা বৃদ্ধি
এই সময়ে হঠাৎ করে চিনি, চকোলেট, বা লবণাক্ত খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বেড়ে যেতে পারে। এর কারণ হলো শরীরে ইনসুলিন ও কর্টিসল হরমোনের ভারসাম্যহীনতা।
এমনকি কারও কারও শরীরে পানি জমে ফুলে যাওয়া বা ওজন অল্প বেড়ে যেতে পারে।
এই craving বা অতিরিক্ত ক্ষুধা যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি ও রক্তে শর্করার ভারসাম্যহীনতা ঘটাতে পারে।
৩. শরীরব্যথা ও স্তনে অস্বস্তি
PMS-এর ৫ থেকে ৭ দিন আগে অনেক নারী স্তনে টান, ফোলাভাব বা সংবেদনশীলতা অনুভব করেন। এর কারণ হলো প্রোজেস্টেরন হরমোনের বৃদ্ধি।
তাছাড়া পিঠে, কোমরে বা পেটে হালকা ব্যথা শুরু হতে পারে, যা মাসিকের ব্যথার পূর্বাভাস দেয়।
চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, এই সময়ে পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা ব্যায়াম এবং লবণাক্ত খাবার কম খেলে এই অস্বস্তি অনেকটা কমানো যায়।
৪. ক্লান্তি ও ঘুমের সমস্যা
মাসিকের এক সপ্তাহ আগে অনেকেই অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা ঘুমঘুম ভাব অনুভব করেন। আবার কেউ কেউ ঠিক উল্টোভাবে ঘুমাতে না পারা বা ইনসমনিয়ায় ভোগেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে কারণ হলো মেলাটোনিন ও প্রোজেস্টেরনের ওঠানামা।
এ সময়ে শরীর যেন বিশ্রাম পায়, সেজন্য রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, স্ক্রিন টাইম কমানো এবং ক্যাফেইন পরিহার করা উপকারী।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
- যদি PMS-এর লক্ষণগুলি অতিরিক্ত তীব্র হয় বা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা দেয়, তবে এটি হতে পারে PMDD (Premenstrual Dysphoric Disorder) — যা চিকিৎসার প্রয়োজন।
- পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা PMS-এর লক্ষণ অনেকাংশে কমাতে সহায়ক।
- ডাক্তাররা পরামর্শ দেন, PMS-এর লক্ষণগুলোর একটি ডায়েরি বা নোট রাখলে নিজের শরীরের ধরণ বোঝা সহজ হয় এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
