রক্তের শ্বেত রক্তকণিকার একটি বিশেষ ধরণ হলো প্লাজমা সেল, যা মূলত অ্যান্টিবডি তৈরি করে আমাদের শরীরকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। তবে যখন এই প্লাজমা সেলগুলো অস্বাভাবিকভাবে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে, তখন তাকে ‘প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডার’ (Plasma Cell Disorder) বলা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এবং জটিল অবস্থা হলো ‘মাল্টিপল মাইলোমা’। এই রোগটি শনাক্ত হওয়ার অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই শরীর অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু ধারাবাহিক কিছু সংকেত দিতে শুরু করে, যা সাধারণ ক্লান্তি বা বয়সের দোষ ভেবে আমরা এড়িয়ে যাই।
নিচে প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডার গুরুতর হওয়ার ৬ মাস আগের ৬টি লক্ষণ এবং এর প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. হাড়ে অব্যক্ত ব্যথা ও বারবার হাড়ের চিড় (Fracture)
প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডারের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো হাড়ের সমস্যা। অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষগুলো হাড়ের ভেতর থেকে ক্যালসিয়াম বের করে দেয়, ফলে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। ৬ মাস আগে থেকেই পিঠের নিচের অংশ, কোমর বা পাঁজরের হাড়ে গভীর ব্যথা অনুভূত হতে পারে। কোনো বড় আঘাত ছাড়াই ছোটখাটো কাজ করতে গিয়ে হাড় ফেটে যাওয়া বা চিড় ধরা এই রোগের একটি স্পষ্ট সংকেত।
২. তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী অ্যানিমিয়া (রক্তস্বল্পতা)
যখন হাড়ের মজ্জা বা বোন ম্যারো অতিরিক্ত প্লাজমা কোষে ভরে যায়, তখন সেখানে লোহিত রক্তকণিকা তৈরির জায়গা কমে যায়। এর ফলে শরীর ধীরে ধীরে রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। ৬ মাস আগে থেকে রোগী প্রচণ্ড ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, সামান্য হাঁটাহাঁটিতে হাঁপিয়ে ওঠা এবং সবসময় শীত বোধ করার মতো সমস্যায় ভোগেন।
৩. বারবার কিডনি জটিলতা ও প্রস্রাবে ফেনা
অস্বাভাবিক প্লাজমা কোষগুলো ‘এম-প্রোটিন’ (M-protein) নামক এক ধরণের ক্ষতিকর প্রোটিন তৈরি করে, যা রক্ত থেকে ফিল্টার হওয়ার সময় কিডনির নালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদি দেখেন আপনার প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হচ্ছে বা কোনো কারণ ছাড়াই কিডনিতে পাথর বা ব্যথা হচ্ছে, তবে এটি প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডারের একটি আগাম লক্ষণ হতে পারে।
৪. হাত-পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরা বা অসাড়তা (Neuropathy)
রক্তে প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে গেলে বা অস্বাভাবিক কোষগুলো স্নায়ুর ওপর চাপ দিলে হাত-পায়ে অবশ ভাব বা সুঁই ফোটানোর মতো অনুভূতি হতে পারে। ৬ মাস আগে থেকেই অনেক রোগী হাতের আঙ্গুল বা পায়ের তলায় অসাড়তা অনুভব করেন, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি’ বলা হয়।
৫. অত্যধিক তৃষ্ণা ও বারবার প্রস্রাব (Hypercalcemia)
হাড় থেকে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে রক্তে মিশে যাওয়ার ফলে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায় (হাইপারক্যালসেমিয়া)। এর ফলে রোগী অস্বাভাবিক তৃষ্ণা অনুভব করেন, বারবার প্রস্রাব হয় এবং চরম কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন। মানসিক বিভ্রান্তি বা খিটখিটে মেজাজও ক্যালসিয়াম বাড়ার একটি মানসিক লক্ষণ।
৬. দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণ বা ইনফেকশন
প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রচুর অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও সেগুলো অকেজো বা ‘মনোক্লোনাল’। ফলে শরীরের আসল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। ৬ মাস আগে থেকেই দেখা যায় ওই ব্যক্তি বারবার নিউমোনিয়া, সাইনাস বা প্রস্রাবের ইনফেকশনে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকেও কাজ হচ্ছে না।
কেন হয় এই সমস্যা?
প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডারের সঠিক কারণ এখনো অজানা, তবে কিছু বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়:
-
বয়স: সাধারণত ৫০ বছরের বেশি ব্যক্তিদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি।
-
পরিবেশগত প্রভাব: অতিরিক্ত রেডিয়েশন বা ক্ষতিকারক রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা।
-
জেনেটিক্স: পরিবারের কারো রক্তের ক্যান্সার বা মাইলোমা থাকলে।
প্রতিরোধ ও করণীয়
প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এর চিকিৎসা অনেক সহজ হয়:
-
রুটিন চেকআপ: বছরে অন্তত একবার ‘সিবিসি’ (CBC) এবং ‘সিরাম প্রোটিন ইলেকট্রোফোরেসিস’ (SPEP) পরীক্ষা করানো উচিত।
-
প্রচুর পানি পান: কিডনি সচল রাখতে এবং অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বের করে দিতে প্রতিদিন অন্তত ৩-৪ লিটার পানি পান করুন।
-
হাড়ের যত্ন: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন, তবে কোনো সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার আগে অবশ্যই রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা পরীক্ষা করে নিন।
-
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: যদি হাড়ের ব্যথা এবং অ্যানিমিয়া একসাথে দেখা দেয়, তবে দ্রুত একজন ‘হেমাটো-অনকোলজিস্ট’ (Hemato-oncologist)-এর পরামর্শ নিন।
প্লাজমা সেল ডিসঅর্ডারকে অবহেলা করলে তা স্থায়ীভাবে কিডনি বিকল বা প্যারালাইসিসের কারণ হতে পারে। তাই ৬ মাস আগের এই লক্ষণগুলো চিনে সচেতন থাকাই সুস্থতার প্রধান পথ।
