বর্ষা মানেই একদিকে প্রকৃতির সজীবতা, অন্যদিকে রোগের মৌসুম। এ সময় পানি জমে থাকা, ড্রেনের উপচে পড়া ও খাদ্যদ্রব্যে দূষণ—সব মিলিয়ে বাড়ে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোগ হলো কলেরা (Cholera)। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষায় বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে নিজেকে ও সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব।
কলেরা কী এবং কেন ভয়ঙ্কর
কলেরা একটি সংক্রামক ডায়রিয়া জাতীয় রোগ, যা ভিব্রিও কলেরি (Vibrio cholerae) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট। রোগটি মূলত দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। এর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি দ্রুত পানিশূন্যতা ঘটিয়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চল, বস্তি ও বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে।
কীভাবে ছড়ায়
কলেরা ভাইরাস ছড়ায় ফিকাল-ওরাল রুটে, অর্থাৎ মলমিশ্রিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে। প্রধান কারণগুলো হলো—
- দূষিত পানি পান করা
- অপরিষ্কারভাবে রান্না বা সংরক্ষিত খাবার খাওয়া
- টয়লেট ব্যবহারের পর হাত না ধোয়া
- মাছ বা সবজি দূষিত পানিতে ধোয়া
- জনবহুল এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল থাকা
উপসর্গ ও জটিলতা
কলেরার উপসর্গ সংক্রমণের ১–৫ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো—
- হঠাৎ প্রচণ্ড পাতলা পায়খানা (rice-water stool)
- অবিরাম বমি
- তীব্র পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)
- মুখ ও চোখ শুকিয়ে যাওয়া
- প্রস্রাব কমে যাওয়া
- দুর্বলতা ও খিঁচুনি
সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে কলেরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুর কারণ হতে পারে, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে।
চিকিৎসা
কলেরার মূল চিকিৎসা হলো শরীরের পানিশূন্যতা পূরণ করা।
প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ওরস্যালাইন (ORS)।
মারাত্মক ক্ষেত্রে শিরায় তরল (IV saline) দেওয়া হয়।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে স্তন্যপান বন্ধ করা যাবে না।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে কলেরায় মৃত্যুহার ১% এরও কম রাখা সম্ভব।
প্রতিরোধের উপায়
কলেরা প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করুন:
- পানি ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে পান করুন।
- বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করলে ঢাকনা দিয়ে রাখুন।
- পানির ট্যাঙ্ক ও পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস:
- রাস্তার ধারের খাবার পরিহার করুন।
- রান্না করা খাবার গরম অবস্থায় খান।
- কাঁচা ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন:
- খাবার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অত্যন্ত জরুরি।
স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করুন:
- ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কার রাখুন।
- টয়লেটের বর্জ্য যেন পানির উৎসে না মেশে তা নিশ্চিত করুন।
টিকা গ্রহণ:
কলেরার টিকা বর্তমানে বাংলাদেশে সহজলভ্য এবং কার্যকর। WHO অনুমোদিত ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (OCV) দুই ডোজে দেওয়া হয়, যা প্রায় তিন বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়।
