x
d o c t o r s 2 4
বাসোফিলিয়া গুরুতর হওয়ার আগে শরীরে যে সব লক্ষণ দেখা দেয়
16 Feb

ইওসিনোফিল বা মোনোসাইটের তুলনায় বাসোফিল (Basophil) আমাদের রক্তে সংখ্যায় খুবই কম থাকে—মোট শ্বেত রক্তকণিকার মাত্র ১ শতাংশেরও কম। কিন্তু এই নগণ্য কোষটিই যখন অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে, তখন তাকে ‘বাসোফিলিয়া’ (Basophilia) বলা হয়। বাসোফিলিয়া মূলত শরীরের কোনো গভীর অ্যালার্জি, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা এমনকি হাড়ের মজ্জার বড় কোনো সমস্যার সংকেত হতে পারে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, রোগটি বড় আকার ধারণ করার প্রায় ৩ মাস আগে থেকেই শরীর অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু সংকেত দিতে শুরু করে।

নিচে বাসোফিলিয়ার ৩ মাস আগে দেখা দেওয়া ৫টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ এবং এর প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. গোসলের পর ত্বকে তীব্র চুলকানি (Pruritus)

বাসোফিলিয়ার অন্যতম বিচিত্র এবং আগাম লক্ষণ হলো গরম পানি দিয়ে গোসলের পর শরীরে চুলকানি হওয়া। বাসোফিল রক্তে বেড়ে গেলে তা প্রচুর পরিমাণে ‘হিস্টামিন’ নিঃসরণ করে। যখন শরীর গরম পানির সংস্পর্শে আসে, এই হিস্টামিন আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ত্বকে লালচে ভাব বা অস্বস্তি তৈরি করে। কোনো র‍্যাশ ছাড়াই ৩ মাস আগে থেকে এমন লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

২. অসহ্য হাড়ের ব্যথা (Bone Pain)

যদি আপনার পিঠের নিচের অংশ, পা বা পাঁজরের হাড়ে গভীর কোনো ব্যথা অনুভূত হয় যা সাধারণ ব্যথানাশকে কমে না, তবে এটি হাড়ের মজ্জায় (Bone Marrow) অস্বাভাবিক বাসোফিল উৎপাদনের লক্ষণ হতে পারে। এটি বিশেষ করে রক্তের কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার ৩ মাস আগের সংকেত হিসেবে দেখা দেয়।

৩. বারবার পেটের আলসার বা বুক জ্বালাপোড়া

বাসোফিলের সংখ্যা বাড়লে পাকস্থলীতে ‘গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড’ নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফলে কোনো কারণ ছাড়াই বারবার পেটে আলসার হওয়া, বুক জ্বালাপোড়া করা বা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার পরেও ১-২ মাস ধরে এই সমস্যা চলতে থাকে, তবে এটি বাসোফিলিয়ার আগাম ইঙ্গিত হতে পারে।

৪. অস্বাভাবিক শারীরিক তাপমাত্রা ও রাতে ঘাম

সাধারণ জ্বর নয়, বরং শরীর সব সময় স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি গরম অনুভূত হওয়া (Low-grade fever) এবং রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ ঘাম হওয়া বাসোফিলিয়ার সংকেত। বাসোফিল রক্তে প্রদাহ সৃষ্টি করে শরীরের ‘থার্মোস্ট্যাট’ বা তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেয়। ৩ মাস আগে থেকে এই লক্ষণটি আসতে-যেতে পারে।

৫. প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া (Splenomegaly) ও পেটের উপরিভাগে ভার বোধ

পেটের বাম দিকের উপরিভাগে যদি সব সময় একটু ভার বোধ হয় বা অল্প খেলেই পেট ভরে যাচ্ছে বলে মনে হয়, তবে বুঝতে হবে আপনার প্লীহা (Spleen) বড় হয়ে যাচ্ছে। রক্তে অতিরিক্ত বাসোফিল ফিল্টার করতে গিয়ে প্লীহার ওপর চাপ পড়ে, যা ৩ মাস আগে থেকেই পেটে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে।

কেন বাড়ে বাসোফিলের মাত্রা?

বাসোফিলিয়া সাধারণত সরাসরি কোনো রোগ নয়, বরং অন্য কোনো সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। এর সাধারণ কারণগুলো হলো:

  • অব্যক্ত অ্যালার্জি: দীর্ঘদিন ধরে অজানা কোনো উপাদানে অ্যালার্জি থাকলে।

  • থাইরয়েডের সমস্যা: বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism)।

  • প্রদাহজনিত রোগ: যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা আলসারেটিভ কোলাইটিস।

  • রক্তের বিশেষ অবস্থা: মাইলোপ্রোলিফারেটিভ ডিসঅর্ডার বা সিএমএল (CML)।

প্রতিরোধ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

বাসোফিলিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং এর ঝুঁকি কমাতে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:

  • অ্যালার্জেন শনাক্তকরণ: আপনার কিসে অ্যালার্জি আছে (যেমন- ধুলা, নির্দিষ্ট খাবার বা ওষুধ) তা খুঁজে বের করুন এবং সেগুলো এড়িয়ে চলুন।

  • পর্যাপ্ত পানি পান: রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং বিষাক্ত উপাদান বের করে দিতে প্রচুর পানি পান করুন।

  • প্রদাহনাশক খাবার: আদা, হলুদ এবং ওমেগা-৩ যুক্ত খাবার (যেমন- তিসি বা সামুদ্রিক মাছ) খাদ্যতালিকায় যোগ করুন যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

  • নিয়মিত পরীক্ষা: যদি এই লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে একটি ‘Absolute Basophil Count’ (ABC) পরীক্ষা করুন। সাধারণত রক্তে বাসোফিলের মাত্রা প্রতি মাইক্রোলিটারে ২০০-এর বেশি হলে চিকিৎসকরা এর কারণ অনুসন্ধানে মনোযোগ দেন।

বাসোফিলিয়া কোনো মামুলি বিষয় নয়, কারণ এটি অনেক সময় হাড়ের মজ্জার জটিলতার প্রথম লক্ষণ হিসেবে কাজ করে। তাই ৩ মাস আগের এই সংকেতগুলো চিনে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

Leave A Comment