x
d o c t o r s 2 4
24 Jan

রক্তনালীর প্রদাহজনিত বিরল রোগ ‘বেহচেটস ডিজিজ’ (Behcet’s Disease) বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন ভুলবশত রক্তনালীকে আক্রমণ করে, তখনই এই জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চূড়ান্ত আক্রমণের অন্তত ৩০ দিন আগে থেকেই শরীর চারটি সুনির্দিষ্ট সংকেতের মাধ্যমে বড় বিপদের আভাস দেয়।

বেহচেটস ডিজিজ মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘মাল্টি-সিস্টেম’ ব্যাধি, যা ধমনী এবং শিরা—উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি অটো-ইমিউন ভাসকুলাইটিস। যদিও এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো অজানা, তবে জেনেটিক এবং পরিবেশগত প্রভাবকে দায়ি করা হয়। বাংলাদেশে এই রোগের প্রকোপ তুলনামূলক কম মনে হলেও, সঠিক রোগ নির্ণয়ের অভাবে অনেক রোগী বছরের পর বছর কষ্ট পান। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি অন্ধত্ব, স্ট্রোক কিংবা পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

১ মাস আগে শরীরে প্রকট হওয়া ৪টি প্রধান লক্ষণ

গবেষকরা দেখেছেন, বেহচেটস ডিজিজ পূর্ণাঙ্গভাবে ছড়িয়ে পড়ার চার সপ্তাহ আগে থেকেই শরীরের বিভিন্ন অংশে এই পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়:

  • বারবার ফিরে আসা মুখের ঘা (Aphthous Ulcers): এটি এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রাথমিক লক্ষণ। সাধারণ মুখের ঘা কয়েক দিনে সেরে গেলেও, বেহচেটস-এর ক্ষেত্রে এগুলো অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হয় এবং সেরে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আবার ফিরে আসে। এক মাস আগে থেকেই ঠোঁট, মাড়ি এবং জিহ্বায় ছোট ছোট গোল আকৃতির ঘা দেখা দেয়।

  • ত্বকের আকস্মিক ফুসকুড়ি বা ব্রণের মতো দাগ: শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে পায়ে লালচে ও উঁচু দানাদার দাগ দেখা দিতে পারে যা স্পর্শ করলে ব্যথা অনুভূত হয় (এরিথেমা নোডোসাম)। অনেক সময় মনে হতে পারে সাধারণ ব্রণ বা অ্যালার্জি, কিন্তু এগুলো আসলে রক্তনালীর ভেতরের প্রদাহের বহিঃপ্রকাশ।

  • চোখে ঝাপসা দেখা এবং লালচে ভাব: চোখের আইরিস বা মধ্যস্তরে প্রদাহ (Uveitis) শুরু হওয়ার ফলে এক মাস আগে থেকেই চোখ মাঝেমধ্যে লাল হয়ে যায়। সেই সাথে দৃষ্টি কিছুটা ঝাপসা হতে পারে এবং আলোতে তাকালে অস্বস্তি বোধ হয়। এটি অবহেলা করলে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে।

  • অকারণে জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলাভাব: কোনো চোট বা অতিরিক্ত পরিশ্রম ছাড়াই হাঁটু, গোড়ালি কিংবা হাতের কবজিতে ব্যথা শুরু হয়। এই ব্যথা সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো প্যাটার্ন মেনে চলে না, বরং শরীরের এক জয়েন্ট থেকে অন্য জয়েন্টে স্থানান্তরিত হতে থাকে।

বেহচেটস ডিজিজ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

এই রোগটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা প্রয়োজন, কারণ এটি কেবল একটি সাধারণ চর্মরোগ নয়:

  • সিল্ক রোড কানেকশন: ঐতিহাসিকভাবে এই রোগটি মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বেশি দেখা যেত বলে একে ‘সিল্ক রোড ডিজিজ’ বলা হয়। তবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এর বিস্তার বাড়ছে।

  • বয়স ও লিঙ্গ: সাধারণত ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রথম প্রকাশ পায়। নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে আক্রান্ত হতে পারেন।

  • প্যাদার্জি টেস্ট: এই রোগ শনাক্ত করার জন্য চিকিৎসকরা ত্বকে একটি বিশেষ সুই ফুটিয়ে পরীক্ষা করেন, যাকে ‘প্যাদার্জি টেস্ট’ বলা হয়। ত্বকের অতিসংবেদনশীলতা পরিমাপের এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি।

প্রতিকার ও সচেতনতা

বেহচেটস ডিজিজ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রদাহ কমানোর জন্য চিকিৎসকরা ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট এবং স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো লক্ষণগুলো চিনে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা সাধারণ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা ডেন্টিস্টের কাছে যান, কিন্তু এটি আসলে রিউমাটোলজিস্ট বা রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করা প্রয়োজন।

বেহচেটস ডিজিজ কেবল একটি শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্টের একটি সংকেত। এক মাস আগে থেকে শরীর যে লক্ষণগুলো দেয়, তাকে গুরুত্ব দিলে বড় ধরণের শারীরিক পঙ্গুত্ব বা জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সুস্থ থাকার জন্য আমাদের শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোকে বুঝতে শিখতে হবে। সচেতনতা এবং সময়োচিত চিকিৎসাই পারে এই রহস্যময় রোগের থাবা থেকে আমাদের জীবনকে রক্ষা করতে।

Leave A Comment