আমাদের শরীরের রক্তে অম্ল ও ক্ষারের ভারসাম্য বজায় রাখা জীবনের জন্য অপরিহার্য। যখন শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীর থেকে অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বেরিয়ে যায়, তখন রক্তে ক্ষারের পরিমাণ বেড়ে যায়—এই অবস্থাকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় রেসপিরেটরি অ্যালকালোসিস। এটি সাধারণত হাইপারভেন্টিলেশন বা দ্রুত শ্বাস নেওয়ার কারণে ঘটে।
অনেকে মনে করেন এটি কেবল তাৎক্ষণিক আতঙ্কের (Panic Attack) কারণে হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ফুসফুস বা হৃদযন্ত্রের অন্তর্নিহিত সমস্যার কারণে রোগটি পূর্ণরূপে প্রকাশ পাওয়ার প্রায় ৩ দিন আগে থেকেই শরীর কিছু সূক্ষ্ম সংকেত দিতে শুরু করে। এই ৪টি লক্ষণ সময়মতো শনাক্ত করা জরুরি।
রেসপিরেটরি অ্যালকালোসিস: চূড়ান্ত পর্যায়ের ৩ দিন আগের ৪টি সতর্কবার্তা
১. ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস নেওয়া বা হাই তোলা (Air Hunger)
লক্ষণটি শুরু হওয়ার ৩ দিন আগে থেকেই রোগী অনুভব করতে পারেন যে তার স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে বুক ভরছে না। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘এয়ার হাঙ্গার’ বলা হয়। আপনি হয়তো খেয়াল করবেন যে আপনি বিনা কারণেই বারবার বড় বড় শ্বাস নিচ্ছেন বা ঘন ঘন হাই তুলছেন। শরীর আসলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে এবং অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য সামলাতে অবচেতনভাবেই এই চেষ্টা চালায়। এটি রেসপিরেটরি অ্যালকালোসিসের প্রথম পর্যায়ের সংকেত।
২. আঙুলের ডগায় ও ঠোঁটে ঝিঁঝিঁ ধরা (Tingling Sensation)
রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা কমতে থাকলে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হতে শুরু করে, যা স্নায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে। ৩ দিন আগে থেকেই আপনি হাত ও পায়ের আঙুলের ডগায় হালকা পিন ফোটানোর মতো অনুভূতি বা অবশ ভাব অনুভব করতে পারেন। বিশেষ করে ঠোঁটের চারপাশের চামড়া টানটান লাগা বা ঝিঁঝিঁ ধরা এই অবস্থার একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট লক্ষণ, যা নির্দেশ করে যে আপনার রক্তের pH লেভেল ক্ষারের দিকে ঝুঁকছে।
৩. হালকা বুক ধড়ফড়ানি ও অস্থিরতা
রক্তে ক্ষারের আধিক্য বাড়লে ক্যালসিয়ামের মাত্রা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে, যা হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সংকেতকে বিঘ্নিত করে। ৩ দিন আগে থেকেই কোনো শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই আপনার বুক ধড়ফড় (Palpitations) করতে পারে। এর সাথে যুক্ত হয় এক ধরণের অজানা আতঙ্ক বা অস্থিরতা। রোগী অনেক সময় বুঝতে পারেন না কেন তিনি উদ্বিগ্ন বোধ করছেন, আসলে এটি শরীরের রাসায়নিক পরিবর্তনের একটি মানসিক বহিঃপ্রকাশ।
৪. মাংসপেশিতে সামান্য কম্পন বা মৃদু খিঁচুনি (Muscle Twitching)
রেসপিরেটরি অ্যালকালোসিসের পূর্ণ বিকাশের আগে পেশিগুলো অস্বাভাবিক সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। আপনি লক্ষ্য করতে পারেন যে আপনার চোখের পাতা কাঁপছে অথবা হাতের পেশিতে ছোট ছোট কম্পন বা ‘টুইচিং’ হচ্ছে। রক্তে আয়নিত ক্যালসিয়াম কমে যাওয়ার ফলে স্নায়ু ও পেশির সংযোগস্থলে এই গোলযোগ দেখা দেয়। ৩ দিন ধরে এই মৃদু কম্পনগুলো চলতে থাকা মানে হলো আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কোনো চাপের মুখে রয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও প্রতিকারে আপনার করণীয়
রেসপিরেটরি অ্যালকালোসিস প্রতিরোধে শান্ত থাকা এবং শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ৩ দিন ধরে এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
-
শ্বাসের ব্যায়াম: প্রতিদিন ৫-১০ মিনিট ‘বক্স ব্রিদিং’ (৪ সেকেন্ড শ্বাস নেওয়া, ৪ সেকেন্ড ধরে রাখা এবং ৪ সেকেন্ড ছাড়া) অভ্যাস করুন। এটি রক্তে $CO_2$ এর মাত্রা স্থিতিশীল রাখে।
-
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: যদি উদ্বেগের কারণে এমন হয়, তবে ক্যাফেইন বা চা-কফি পানের মাত্রা কমিয়ে দিন।
-
ডাক্তারি পরামর্শ: যদি লক্ষণগুলো না কমে, তবে ধমনী থেকে রক্ত নিয়ে ‘Arterial Blood Gas (ABG)’ পরীক্ষা করানো জরুরি। এটি রক্তের অম্ল-ক্ষারের সঠিক অবস্থা জানিয়ে দেয়।
সতর্কতা:
যদি হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় এবং হাত-পা শক্ত হয়ে আসে, তবে কাগজের ব্যাগের ভেতর শ্বাস নেওয়ার পুরনো পদ্ধতি (Rebreathing) চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া করবেন না, কারণ এটি অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে।
