x
d o c t o r s 2 4
লরেন্স-মুন সিন্ড্রোম কী? শনাক্তের ২ বছর আগের ৫টি লক্ষণ প্রকাশ পায়
10 Feb

লরেন্স-মুন সিন্ড্রোম (Laurence-Moon Syndrome) একটি অত্যন্ত বিরল এবং জটিল বংশগত রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে অনেক সময় ‘লরেন্স-মুন-বারডেট-বিডল সিন্ড্রোম’ (LMBBS)-এর একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়। এটি মূলত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

এই রোগের পূর্ণাঙ্গ লক্ষণগুলো সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালে বা কৈশোরে স্পষ্ট হয়। তবে গবেষকদের মতে, রোগটি চূড়ান্তভাবে শনাক্ত হওয়ার অন্তত ২ বছর আগে থেকে শিশুর শরীরে ৫টি বিশেষ সংকেত দেখা দিতে শুরু করে। সময়মতো এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে শিশুর জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।

লরেন্স-মুন সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বুঝতে নিচের ৫টি প্রাথমিক লক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

১. রাতের অন্ধকারে চলাফেরায় জড়তা (Night Blindness):

এই সিন্ড্রোমের সবচেয়ে বড় সংকেত হলো ‘রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা’। রোগটি পুরোপুরি ধরা পড়ার প্রায় ২ বছর আগে থেকেই শিশু রাতের বেলা বা আবছা আলোতে চোখে কম দেখতে শুরু করে। যদি দেখেন আপনার শিশু অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছে বা আসবাবপত্রের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে, তবে এটি মোটেও অবহেলা করবেন না।

২. অস্বাভাবিক দ্রুত ওজন বৃদ্ধি (Early Obesity):

যদিও অনেক শিশুই একটু নাদুস-নুদুস হয়, কিন্তু লরেন্স-মুন সিন্ড্রোমের ক্ষেত্রে শিশুর ওজন কোনো কারণ ছাড়াই খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশেষ করে পেটের অংশে মেদ জমার প্রবণতা দেখা দেয়। ২ বছর আগে থেকেই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করেও শিশুর শরীরের গড়ন অস্বাভাবিক ভারি হতে শুরু করে।

৩. পেশীর শক্ত ভাব ও ভারসাম্যহীনতা (Spasticity and Ataxia):

লরেন্স-মুন সিন্ড্রোমের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পায়ের পেশী শক্ত হয়ে যাওয়া (Spasticity)। রোগ নির্ণয়ের অনেক আগে থেকেই শিশু হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারাতে পারে অথবা তার হাঁটার ধরণ কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। হাতের সূক্ষ্ম কাজ যেমন পেন্সিল ধরা বা বোতাম লাগানোতেও শিশু হিমশিম খেতে পারে।

৪. কথা বলা ও শিখতে দেরি হওয়া (Developmental Delay):

সমবয়সী অন্যান্য শিশুদের তুলনায় এই শিশুরা অনেক দেরিতে কথা বলতে শেখে। স্কুলে তাদের শেখার গতি ধীর থাকে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ে। ২ বছর আগে থেকেই শিশুর মধ্যে নতুন কিছু শেখার প্রতি অনাগ্রহ বা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

৫. হরমোনজনিত শারীরিক পরিবর্তন:

লরেন্স-মুন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে শৈশব থেকেই হরমোনের অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে জননাঙ্গ স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হতে পারে (Hypogonadism)। বয়সের সাথে সাথে শারীরিক ও যৌন বিকাশ যেভাবে হওয়ার কথা, তার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ২ বছর আগে থেকেই অনুপস্থিত থাকতে পারে।

কেন হয় এই সিন্ড্রোম?

এটি একটি অটোসোমাল রিসেসিভ (Autosomal Recessive) জেনেটিক ডিসঅর্ডার। যদি বাবা ও মা উভয়েই এই রোগের ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক হন, তবে সন্তানের এই সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের (Consanguineous marriage) ইতিহাস থাকলে এই ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়।

রোগ নির্ণয় ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা

বর্তমানে আধুনিক জেনেটিক টেস্টিং এবং ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই রোগটি নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া চোখের রেটিনা পরীক্ষা (Fundoscopy) এবং কিডনির আল্ট্রাসনোগ্রাম করাও জরুরি, কারণ এই সিন্ড্রোমে কিডনির জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

করণীয়:

  • ভিজ্যুয়াল এইড: দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের গতি কমাতে বিশেষ চশমা বা সহায়ক যন্ত্র ব্যবহার।

  • ফিজিওথেরাপি: পেশীর শক্ত ভাব কমাতে এবং হাঁটার ভারসাম্য বজায় রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম।

  • ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ: স্থূলতা কমাতে শৈশব থেকেই পুষ্টিকর ও নিয়ন্ত্রিত ডায়েট।

 

লরেন্স-মুন সিন্ড্রোম একটি জীবনব্যাপী চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় হলে এবং পরিবার থেকে উপযুক্ত মানসিক ও শারীরিক সহায়তা পেলে এই শিশুরা একটি সুশৃঙ্খল জীবন অতিবাহিত করতে পারে।

Leave A Comment