x
d o c t o r s 2 4
শরীরের অদৃশ্য ঢাল যখন ভেঙে পড়ে!
07 Feb

শ্বেত রক্তকণিকা বা হোয়াইট ব্লাড সেল (WBC) আমাদের শরীরের অদৃশ্য সেনাবাহিনী। এদের মূল কাজ হলো বাইরের শত্রু যেমন—ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং ক্ষতিকারক ছত্রাকের বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সুস্থ রাখা। যখন এই রক্তকণিকার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় (লিউকোসাইটোসিস) কিংবা কমে যায় (লিউকোমেনিয়া), তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে।

চিকিৎসকদের মতে, ব্লাড ক্যান্সারের মতো গুরুতর ব্যাধি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী শ্বেত রক্তকণিকা ডিসঅর্ডার চূড়ান্তভাবে ধরা পড়ার অন্তত ১ মাস আগে থেকেই শরীর ৪টি বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো অবহেলা করলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হতে পারে।

রক্তে শ্বেত রক্তকণিকার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ১ মাস আগে থেকে নিচের পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়:

১. অব্যাহত স্বল্পমাত্রার জ্বর ও রাতের ঘাম:

শ্বেত রক্তকণিকার ডিসঅর্ডার থাকলে শরীর ছোটখাটো সংক্রমণের বিরুদ্ধেও কার্যকরভাবে লড়তে পারে না। ১ মাস আগে থেকেই দেখা যায়, কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের তাপমাত্রা ৯৯-১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের আশেপাশে থাকছে। বিশেষ করে রাতের বেলা ঘুমানোর সময় শরীর অস্বাভাবিকভাবে ঘামতে থাকে (Night Sweats), যা অভ্যন্তরীণ কোষীয় প্রদাহের একটি বড় লক্ষণ।

২. মুখে ও গলায় দীর্ঘস্থায়ী ঘা বা ইনফেকশন:

আমাদের মুখের ভেতর এবং গলার টিস্যুগুলো খুবই সংবেদনশীল। ১ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করতে পারেন যে জিভ, মাড়ি বা গলার ভেতরে ছোট ছোট লাল বা সাদাটে ঘা (Ulcer) হচ্ছে যা কিছুতেই সারছে না। শ্বেত রক্তকণিকা বা নিউট্রোফিলের সংখ্যা কমে গেলে মুখের ব্যাকটেরিয়াগুলো দ্রুত বংশবৃদ্ধি শুরু করে, ফলে এই ইনফেকশনগুলো বার বার ফিরে আসে।

৩. গ্রন্থি ফুলে যাওয়া এবং ত্বকের পরিবর্তন:

শ্বেত রক্তকণিকা মূলত লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থিতে তৈরি ও সংরক্ষিত হয়। ১ মাস আগে থেকেই ঘাড়, বগল বা কুঁচকির (Groin) লিম্ফ নোডগুলো মটরদানার মতো ফুলে উঠতে পারে এবং চাপ দিলে ব্যথা হতে পারে। এর পাশাপাশি ত্বকে ছোট ছোট লাল বিন্দু বা ফুসকুড়ি (Petechiae) দেখা দিতে পারে, যা রক্তকণিকার অসামঞ্জস্যতাকে নির্দেশ করে।

৪. হাড়ের গভীরে ব্যথা ও তীব্র অবসাদ:

শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি হয় হাড়ের মজ্জা বা বোন ম্যারো-তে। যখন মজ্জার ভেতর রক্তকণিকা তৈরিতে ত্রুটি দেখা দেয়, তখন হাড়ের ভেতরে এক ধরণের ভোঁতা বা কামড়ানো ব্যথা অনুভূত হয়। ১ মাস আগে থেকেই রোগী নিজেকে এতটাই ক্লান্ত অনুভব করেন যে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা বা স্বাভাবিক হাঁটাচলাও তার কাছে পাহাড় সমান বোঝা মনে হয়।

‘ক্লনাল হেমাটোপয়েসিস’ ও নীরব হার্ট অ্যাটাক

সাম্প্রতিক কার্ডিও-অ্যানকোলজি গবেষণায় দেখা গেছে, শ্বেত রক্তকণিকার ডিসঅর্ডার কেবল ইমিউন সিস্টেম নষ্ট করে না, বরং এটি ধমনীতে প্লাক (Plaque) জমানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। রক্তে অস্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকা থাকলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি ৫ গুণ বেড়ে যেতে পারে। ১ মাস আগে থেকে যদি অস্বাভাবিক ক্লান্তির সাথে শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন, তবে তা কেবল ইমিউন সমস্যা নয়, হৃদরোগের সংকেতও হতে পারে।

শনাক্তকরণ ও সুরক্ষা

শ্বেত রক্তকণিকার সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করতে এবং সুস্থ থাকতে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:

  • কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC): ১ মাস আগে থেকে কোনো লক্ষণ দেখা দিলে প্রথমেই একটি সিবিসি টেস্ট করুন। এতে নিউট্রোফিল, লিম্ফোসাইট এবং মনোসাইটের সঠিক সংখ্যা জানা যায়।

  • বোন ম্যারো বায়োপসি: যদি রক্ত পরীক্ষায় বড় ধরণের অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়, তবে চিকিৎসক বোন ম্যারো পরীক্ষা করতে পারেন।

  • পুষ্টিকর খাদ্য ও হাইজিন: কাঁচা সবজি বা ফল ধুয়ে খাওয়া এবং রান্না করা খাবার খাওয়া জরুরি, কারণ শ্বেত রক্তকণিকা কম থাকলে সাধারণ ফুড পয়জনিং থেকেও বড় ক্ষতি হতে পারে।

শ্বেত রক্তকণিকার ডিসঅর্ডার মানেই ক্যান্সার নয়, অনেক সময় এটি ভিটামিন বি-১২ এর অভাব বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও হতে পারে। তবে ১ মাস আগে দেখা দেওয়া এই ৪টি লক্ষণ অবহেলা করা মানে নিজের শরীরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। সচেতনতা এবং সময়মতো রক্ত পরীক্ষাই আপনার জীবন বাঁচাতে পারে।

Leave A Comment