স্থূলতা ডায়াবেটিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্থূলতায় আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বেঙ্গালুরুর মণিপাল হাসপাতালের ব্যারিয়াট্রিক এবং অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি বিভাগের গবেষণায় এর কারণ খুঁজে বের করা হয়েছে।
চিকিৎসকরা জানান, স্থূল ব্যক্তিদের অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন শরীরের টিস্যু দ্বারা কার্যকরভাবে শোষিত হয় না, যার ফলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এটি পেশীতে ব্যথা, টিংলিং সংবেদন এবং অতি সংবেদনশীলতার মতো সমস্যা সৃষ্টি করে। এমনকি সামান্য চাপও তীব্র ব্যথার কারণ হতে পারে। এছাড়া, রোগীরা জয়েন্টের সীমিত গতিশীলতা, পায়ে খিঁচুনি এবং দমকা ব্যথা অনুভব করতে পারেন। এগুলো ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি এবং হাইপারইনসুলিনমিয়ার লক্ষণ।
ডায়াবেটিসের প্রভাব: পেশী ও স্নায়ুর ক্ষতি
ডাঃ মঈনুদ্দিন ব্যাখ্যা করেন, ডায়াবেটিসের কারণে স্থূলতা পায়ে সংক্রমণ এবং ফোলাভাব সৃষ্টি করতে পারে, যা জয়েন্টের গতিশীলতাকে আরও সীমিত করে। এই রোগীরা প্রায়ই ঠান্ডার প্রতি অতি সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। এই উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য রক্তে শর্করার মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। স্বাস্থ্যকর শর্করার মাত্রা বজায় রাখলে পেশী ব্যথা কমে, এবং বি-ভিটামিন সম্পূরক গ্রহণ ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির লক্ষণগুলো হ্রাস করতে সাহায্য করে। এছাড়া, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং হালকা ব্যায়াম এই সমস্যাগুলো কমাতে কার্যকর।
ডায়াবেটিস মেলিটাস কী?
ডাঃ আদিত্য জি হেগডে, মণিপাল হাসপাতাল (ওল্ড এয়ারপোর্ট রোড), বেঙ্গালুরুর ডায়াবেটিস এবং এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের পরামর্শদাতা জানান, ডায়াবেটিস মেলিটাস (ডিএম) একটি সিস্টেমিক রোগ, যা ক্রমাগত উচ্চ রক্তশর্করা (হাইপারগ্লাইসেমিয়া) দ্বারা সৃষ্ট। এর দুটি প্রধান ধরন রয়েছে: টাইপ-১ এবং টাইপ-২, যেখানে টাইপ-২ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। ভারতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস তরুণ বয়সে এবং তুলনামূলকভাবে কম বডি মাস ইনডেক্সে (বিএমআই) দেখা যায়, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় উদ্বেগজনক।
ডিএম-এর সঙ্গে যুক্ত পেশীবহুল জটিলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পেশী ক্র্যাম্প: ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা, হাইপোগ্লাইসেমিয়া এবং পেরিফেরাল ভাস্কুলার রোগের কারণে নীচের অঙ্গগুলোতে রাতে তীব্র ব্যথা হয়।
- পেশী ইনফার্কশন: একটি বিরল কিন্তু গুরুতর অবস্থা, যা দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ইস্কেমিয়ার ফলে হয়। এটি ইনসুলিন-নির্ভর রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
- পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি: স্নায়ুর ক্ষতির কারণে টিংলিং, অসাড়তা এবং ব্যথা হয়।
- রিফ্লেক্স সিমপ্যাথেটিক ডিস্ট্রফি সিন্ড্রোম: এটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এবং ফোলাভাব সৃষ্টি করে।
প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা
চিকিৎসকরা জানান, ডায়াবেটিসের জটিলতা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত রক্তশর্করা পরীক্ষা, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি পান এবং শারীরিক কার্যকলাপ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া, ধূমপান ত্যাগ এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিভিন্ন প্রতিরোধ কর্মসূচি, যেমন কেরালার ডায়াবেটিস প্রিভেনশন প্রোগ্রাম, দেখিয়েছে যে সম্প্রদায়ভিত্তিক জীবনযাত্রার পরিবর্তন টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে।
ডায়াবেটিস শুধু রক্তশর্করার সমস্যা নয়, এটি হৃদরোগ, কিডনি বিকল, চোখের রেটিনোপ্যাথি এবং স্নায়বিক জটিলতার মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ এবং সচেতনতা এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চাবিকাঠি।
