x
d o c t o r s 2 4
21 Jan

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (MS) হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল রোগ, যা মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের স্নায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে। এটি মূলত একটি অটোইমিউন ডিসঅর্ডার, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত স্নায়ুর রক্ষাকারী আবরণ ‘মায়েলিন’ (Myelin) ধ্বংস করতে শুরু করে। মায়েলিন ক্ষতিগ্রস্ত হলে মস্তিষ্ক থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে সংকেত পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হয়, যার ফলে শারীরিক ও মানসিক নানা জটিলতা দেখা দেয়।

নিচে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের প্রকৃতি, এর সূক্ষ্ম লক্ষণ এবং আধুনিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয় এবং এটি সরাসরি ক্যানসারও নয়। তবে এটি একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। সাধারণত ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যায়।

এমএস (MS)-এর প্রাথমিক ও জটিল লক্ষণসমূহ

এই রোগের লক্ষণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ যা দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ্য করা যায়:

  • অসাড়তা ও ঝিনঝিন ভাব: শরীর বা হাত-পায়ের কোনো একপাশে হঠাৎ করে অবশ হয়ে যাওয়া বা বৈদ্যুতিক শকের মতো অনুভূতি হওয়া।

  • দৃষ্টিশক্তির সমস্যা: এক চোখে ঝাপসা দেখা, দ্বৈত দৃষ্টি (Double vision) বা চোখ নাড়াচাড়া করলে ব্যথা হওয়া। এটি এমএস-এর অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ।

  • ভারসাম্যহীনতা ও হাঁটাচলায় সমস্যা: হাঁটতে গেলে টলে যাওয়া, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া (Spasticity) এবং শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।

  • প্রচণ্ড ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও শরীরজুড়ে এক ধরনের গভীর অবসাদ কাজ করা।

  • মানসিক ও জ্ঞানীয় পরিবর্তন: কথা জড়িয়ে যাওয়া, মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া এবং অকারণে মেজাজ পরিবর্তন বা বিষণ্ণতা।

‘লারমিট সাইন’ ও নীরব আক্রমণ

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের একটি বিশেষ লক্ষণ হলো ‘লারমিট সাইন’ (Lhermitte’s sign)। রোগী যখন ঘাড় সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে নামান, তখন মেরুদণ্ড দিয়ে একটি বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মতো শিহরণ বয়ে যায়। এছাড়া অনেক সময় কোনো বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়াই ভেতরে ভেতরে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, যাকে চিকিৎসকরা ‘সাইলেন্ট প্রগ্রেশন’ বলেন। বর্তমানে উন্নত MRI (Magnetic Resonance Imaging) প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের এই সূক্ষ্ম ক্ষত বা ‘লেশন’ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

পুনর্বাসন (Rehabilitation): ফিরে পাওয়ার নতুন আশা

যেহেতু এমএস-এর কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই, তাই ‘রিহ্যাবিলিটেশন’ বা পুনর্বাসনই হলো এই রোগের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক পুনর্বাসন ব্যবস্থায় কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়:

১. ফিজিওথেরাপি (Physical Therapy): বিশেষ ব্যায়ামের মাধ্যমে পেশির শক্ত ভাব কমানো এবং শরীরের ভারসাম্য ও হাঁটার ক্ষমতা ধরে রাখা হয়।

২. অকুপেশনাল থেরাপি (Occupational Therapy): দৈনন্দিন কাজ যেমন—খাবার খাওয়া, পোশাক পরা বা টাইপ করার মতো কাজগুলো সহজ করার জন্য রোগীকে বিভিন্ন কৌশল ও সহায়ক যন্ত্রের ব্যবহার শেখানো হয়।

৩. স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি: কথা বলতে অসুবিধা হলে বা খাবার গিলতে সমস্যা হলে এই থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর।

৪. কগনিটিভ রিহ্যাবিলিটেশন: স্মৃতিশক্তি বাড়ানো এবং মানসিক ধীরতা কাটিয়ে উঠতে বিশেষজ্ঞের সহায়তায় বিশেষ ব্রেন গেম ও থেরাপি দেওয়া হয়।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ‘ডিজিজ মডিফাইং থেরাপি’ (DMT) গ্রহণ করলে রোগের গতি কমিয়ে আনা এবং পঙ্গুত্বের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। এছাড়া ভিটামিন-ডি এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস স্নায়ুর স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস মানেই জীবনের শেষ নয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং নিয়মিত পুনর্বাসন থেরাপির মাধ্যমে এমএস আক্রান্ত ব্যক্তিও দীর্ঘ সময় সক্রিয় ও কর্মক্ষম থাকতে পারেন। আপনার শরীরে বা পরিচিত কারো মধ্যে যদি দীর্ঘস্থায়ী অসাড়তা বা দৃষ্টির সমস্যা দেখা দেয়, তবে দেরি না করে একজন নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

Leave A Comment