হাইপারপ্রোল্যাকটিনেমিয়া (Hyperprolactinemia) এমন একটি অবস্থা যেখানে রক্তে ‘প্রোল্যাকটিন’ হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। প্রোল্যাকটিন মূলত পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় এবং এটি প্রসূতি মায়েদের স্তন্যদানে সাহায্য করে। কিন্তু গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদানকাল ছাড়াই যদি এই হরমোন বৃদ্ধি পায়, তবে তা নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরের মারাত্মক হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ার অন্তত ২ মাস আগে থেকেই শরীর কিছু সূক্ষ্ম সংকেত পাঠাতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে পিটুইটারি টিউমার (Prolactinoma) বা বন্ধ্যাত্বের মতো জটিলতা শুরুতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
রক্তে প্রোল্যাকটিন বাড়তে শুরু করলে ২ মাস আগে থেকে শরীরে নিম্নলিখিত পরিবর্তনগুলো দেখা দেয়:
১. অনিমিত মাসিক বা পিরিয়ড মিস হওয়া (Menstrual Irregularities):
এটি নারীদের ক্ষেত্রে প্রথম সতর্ক সংকেত। প্রোল্যাকটিন হরমোন শরীরে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধা দেয়। ফলে ২ মাস আগে থেকেই মাসিক অনিয়মিত হতে শুরু করে অথবা পিরিয়ডের স্থায়িত্ব কমে যায়। অনেক সময় কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ এক মাস পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
২. স্তনে ব্যথা এবং অস্বাভাবিক নিঃসরণ (Galactorrhea):
গর্ভাবস্থা ছাড়াই স্তন স্পর্শ করলে বা নিজে থেকেই যদি হালকা সাদা তরল বা দুধের মতো নিঃসরণ দেখা দেয়, তবে এটি হাইপারপ্রোল্যাকটিনেমিয়ার স্পষ্ট লক্ষণ। এছাড়া ২ মাস আগে থেকেই স্তনে এক ধরণের ভারি ভাব বা স্পর্শকাতরতা (Sensitivity) অনুভূত হতে পারে।
৩. লিবিডো বা যৌন আকাঙ্ক্ষা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়া:
প্রোল্যাকটিন সরাসরি সেক্স হরমোনকে (নারীদের ইস্ট্রোজেন ও পুরুষদের টেস্টোস্টেরন) দমন করে। এর ফলে ২ মাস আগে থেকেই নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যে যৌন মিলনের প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বা লিঙ্গউত্থানে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪. দৃষ্টিশক্তির সূক্ষ্ম পরিবর্তন ও মাথাব্যথা:
যদি প্রোল্যাকটিন বাড়ার কারণ পিটুইটারি গ্রন্থির ছোট কোনো টিউমার হয়, তবে তা অপটিক নার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ২ মাস আগে থেকেই রোগী লক্ষ্য করতে পারেন যে তার চোখের দুপাশ (Peripheral Vision) ঝাপসা হয়ে আসছে অথবা ঘন ঘন কপালে ও দুই চোখের মাঝখানে হালকা মাথাব্যথা করছে।
৫. মানসিক অবসাদ এবং ঘুমের ব্যাঘাত:
হরমোনের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মস্তিষ্কের ডোপামিন লেভেলকে প্রভাবিত করে। ফলে ২ মাস আগে থেকেই ব্যক্তি খিটখিটে মেজাজ, অকারণে দুশ্চিন্তা এবং রাতে গভীর ঘুম না হওয়ার সমস্যায় ভুগতে পারেন।
হাড়ের ঘনত্ব ও প্রোল্যাকটিন
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী হাইপারপ্রোল্যাকটিনেমিয়া শরীরের ক্যালসিয়াম শোষণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ২ মাস আগে থেকেই রোগী পিঠের নিচের দিকে বা অস্থিসন্ধিতে হালকা ব্যথা অনুভব করতে পারেন। যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি দ্রুত ‘অস্টিওপোরোসিস’ বা হাড় ক্ষয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
কেন হয় এই সমস্যা?
-
পিটুইটারি এডেনোমা: পিটুইটারি গ্রন্থিতে ছোট ও নন-ক্যান্সারাস টিউমার।
-
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্ণতা বা গ্যাস্ট্রিকের কিছু ওষুধ প্রোল্যাকটিন বাড়িয়ে দিতে পারে।
-
থাইরয়েডের সমস্যা: হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে অনেক সময় প্রোল্যাকটিন লেভেল বেড়ে যায়।
-
অতিরিক্ত মানসিক চাপ: দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে।
চিকিৎসা ও করণীয়
-
সিরাম প্রোল্যাকটিন টেস্ট: সকালে খালি পেটে এই রক্ত পরীক্ষাটি করা জরুরি।
-
এমআরআই (MRI): মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থা দেখার জন্য চিকিৎসক এমআরআই দিতে পারেন।
-
ওষুধ: ডোপামিন অ্যাগোনিস্ট (যেমন: Cabergoline বা Bromocriptine) জাতীয় ওষুধের মাধ্যমে খুব সহজেই এই হরমোন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
হাইপারপ্রোল্যাকটিনেমিয়া বর্তমান সময়ের একটি সাধারণ কিন্তু অবহেলিত সমস্যা। ২ মাস আগের এই লক্ষণগুলো চিনতে পারলে আপনি কেবল বন্ধ্যাত্ব নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
