ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হঠাৎ করেই জীবনঝুঁকিপূর্ণ জটিলতা দেখা দিতে পারে। তেমনই একটি মারাত্মক অবস্থা হলো হাইপারওসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট, Hyperosmolar Hyperglycemic State (এইচএইচএস)। এটি মূলত টাইপ–২ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে কোমা বা মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আগে শরীরে কিছু সতর্ক সংকেত স্পষ্টভাবে দেখা দিতে শুরু করে।
হাইপারওসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট কী?
এইচএইচএস হলো এমন একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যায় (প্রায়ই ৬০০ mg/dL বা তার বেশি), কিন্তু কিটোনের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে এটি Diabetic ketoacidosis (ডিকেএ)-এর থেকে আলাদা। সাধারণত সংক্রমণ, পানিশূন্যতা, স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো শারীরিক চাপের কারণে এটি ট্রিগার হতে পারে।
২ দিন আগে যে ৬টি লক্ষণ দেখা দিতে পারে
১. অস্বাভাবিক তৃষ্ণা বৃদ্ধি
হঠাৎ করেই অতিরিক্ত পিপাসা পাওয়া এইচএইচএসের প্রথম দিকের লক্ষণ। শরীর অতিরিক্ত শর্করা বের করে দিতে গিয়ে প্রচুর পানি হারায়, ফলে তৃষ্ণা বাড়ে।
২. ঘন ঘন প্রস্রাব
রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে গেলে কিডনি তা বের করে দিতে কাজ করে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্রাব হয়, যা দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করে।
৩. তীব্র দুর্বলতা ও ক্লান্তি
শরীরের কোষ পর্যাপ্ত গ্লুকোজ ব্যবহার করতে না পারায় শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। রোগী অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করেন এবং দৈনন্দিন কাজ করতে কষ্ট হয়।
৪. মুখ ও ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
পানিশূন্যতার কারণে ঠোঁট ফেটে যাওয়া, ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হওয়া—এসব লক্ষণ উপেক্ষা করা উচিত নয়।
৫. ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিবিভ্রাট
রক্তে অতিরিক্ত শর্করা চোখের লেন্সে সাময়িক ফোলাভাব তৈরি করতে পারে। ফলে হঠাৎ ঝাপসা দেখা বা চোখে অস্বস্তি হতে পারে।
৬. বিভ্রান্তি বা আচরণে পরিবর্তন
এইচএইচএসের অন্যতম বিপজ্জনক লক্ষণ হলো মানসিক বিভ্রান্তি। রোগী অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারেন, কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখা দিতে পারে, এমনকি অচেতনও হয়ে যেতে পারেন।
কেন এটি দ্রুত মারাত্মক হয়ে ওঠে?
এইচএইচএসে শরীর চরম পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং রক্ত ঘন হয়ে যায়। এতে স্ট্রোক, খিঁচুনি বা কোমার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। অনেক সময় রোগী বুঝতেই পারেন না যে রক্তে শর্করা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ—বিশেষ করে নিউমোনিয়া বা ইউরিন ইনফেকশন—এই অবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জ্বর বা সংক্রমণ হলে রক্তে শর্করা নিয়মিত মাপা অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
এইচএইচএস একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। হাসপাতালে ভর্তি করে দ্রুত শিরায় স্যালাইন দিয়ে পানিশূন্যতা পূরণ করা, ইনসুলিন দেওয়া এবং ইলেকট্রোলাইট ব্যালান্স ঠিক করা হয়।
প্রতিরোধে যা জরুরি—
- নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা
- পর্যাপ্ত পানি পান
- অসুস্থতার সময় ‘সিক ডে রুল’ মেনে চলা
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ না করা
সচেতন থাকুন, জীবন বাঁচান
হাইপারওসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট হঠাৎ করে তৈরি হলেও এর আগাম লক্ষণগুলো স্পষ্ট। বিশেষ করে টাইপ–২ ডায়াবেটিস রোগীরা যদি তৃষ্ণা, অতিরিক্ত প্রস্রাব বা মানসিক বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ অনুভব করেন, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
