হাইপারমোবিলিটি সিন্ড্রোম (Joint Hypermobility Syndrome) এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের জয়েন্ট বা সন্ধিগুলো স্বাভাবিক সীমার চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত হতে পারে। একে সহজ ভাষায় ‘ডাবল জয়েন্টেড’ হওয়া বলা হয়। যদিও অনেকে একে শারীরিক কসরতের জন্য আশীর্বাদ মনে করেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি জয়েন্টে ব্যথা, ইনজুরি এবং স্নায়বিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিন্ড্রোমটি যখন তীব্র ব্যথার রূপ নেয়, তার অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই শরীর কিছু সূক্ষ্ম সংকেত পাঠাতে শুরু করে। এই সংকেতগুলো চিনতে পারলে হাড় ও জয়েন্টের বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
হাইপারমোবিলিটি সিন্ড্রোম শনাক্ত হওয়ার ৬ মাস আগে থেকেই শরীরে নিম্নলিখিত ৬টি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতে পারে:
১. চলাফেরার সময় জয়েন্টে ‘ক্লিক’ বা কটকট শব্দ:
৬ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করবেন যে হাঁটাচলা করার সময় বা হাত-পা নাড়ানোর সময় হাঁটু, কোমর বা আঙুলের জয়েন্ট থেকে এক ধরণের শব্দ (Clicking sound) হচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে আপনার লিগামেন্টগুলো জয়েন্টকে সঠিক জায়গায় ধরে রাখতে পারছে না এবং হাড়গুলো ঘর্ষণ খাচ্ছে।
২. অস্বাভাবিক শারীরিক নমনীয়তা (অকস্মাৎ বৃদ্ধি):
আগে যা পারতেন না, হঠাৎ করেই যদি দেখেন আপনি খুব সহজে হাতের তালু মেঝেতে ঠেকিয়ে দিতে পারছেন বা আঙুলগুলো অস্বাভাবিক বাঁকিয়ে ফেলছেন, তবে এটি বিপদের সংকেত। ৬ মাস আগে থেকেই শরীরের কানেক্টিভ টিস্যুগুলো ঢিলে হতে শুরু করে, যা নমনীয়তা বাড়িয়ে দিলেও জয়েন্টকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
৩. রাতের বেলা পায়ে কামড়ানো বা তীব্র ব্যথা (Growing Pains):
সারাদিন কোনো ভারী কাজ না করলেও সন্ধ্যার পর বা রাতে ঘুমানোর সময় পায়ে তীব্র ব্যথা বা শিরশিরানি অনুভূত হয়। এটি মূলত জয়েন্টের অতিরিক্ত নমনীয়তাকে সামাল দিতে গিয়ে পেশীর ক্লান্তির ফল। ৬ মাস আগে থেকেই এই ব্যথার হার বাড়তে থাকে।
৪. ঘন ঘন পেশীর টান বা স্প্যাজম:
লিগামেন্ট যখন ঢিলে হয়ে যায়, তখন পেশীগুলো হাড়কে রক্ষা করার জন্য অতিরিক্ত টানটান হয়ে থাকে। এর ফলে পিঠ, ঘাড় বা উরুর পেশীতে ঘন ঘন টান (Cramps) লাগতে শুরু করে। এটি হাইপারমোবিলিটি সিন্ড্রোমের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ।
৫. শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা:
আপনি কি সমতলে হাঁটতে গিয়েও বারবার হোঁচট খাচ্ছেন? ৬ মাস আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ‘প্রোপ্রিওসেপশন’ (Proprioception) বা শরীরের অবস্থান বোঝার ক্ষমতা কমতে শুরু করে। জয়েন্টগুলো ঢিলে হওয়ার কারণে মস্তিষ্ক পায়ের সঠিক অবস্থান বুঝতে ভুল করে, ফলে ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।
৬. ত্বকের অতিরিক্ত কোমলতা ও স্ট্রেচ মার্ক:
হাইপারমোবিলিটি সিন্ড্রোম কেবল হাড়ের নয়, এটি ত্বকের ওপরও প্রভাব ফেলে। ৬ মাস আগে থেকে আপনি লক্ষ্য করতে পারেন যে আপনার ত্বক অস্বাভাবিক নরম ও পাতলা হয়ে যাচ্ছে এবং ওজন না বাড়লেও বিভিন্ন স্থানে ‘স্ট্রেচ মার্ক’ বা ফাটা দাগ দেখা দিচ্ছে।
অন্ত্রের সমস্যা ও হাইপারমোবিলিটি
সাম্প্রতিক গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে—যাদের জয়েন্ট হাইপারমোবিলিটি আছে, তাদের মধ্যে ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (IBS) বা হজমের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ, আমাদের পরিপাকতন্ত্রের দেয়ালেও কানেক্টিভ টিস্যু থাকে। যদি ৬ মাস আগে থেকে জয়েন্টে ব্যথার সাথে পেটের সমস্যা শুরু হয়, তবে তা নিশ্চিতভাবে এই সিন্ড্রোমের লক্ষণ হতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়: সুস্থ থাকার ৫টি ধাপ
-
শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম (Isometrics): স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়ামের চেয়ে পেশী শক্তিশালী করার ব্যায়াম বেশি কার্যকর। এটি জয়েন্টকে সুরক্ষা দেয়।
-
সঠিক জুতো ব্যবহার: জয়েন্টের ওপর চাপ কমাতে শক-অ্যাবজরবিং জুতো ব্যবহার করুন।
-
ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম: হাড় ও পেশীর সংযোগস্থল মজবুত রাখতে এই পুষ্টি উপাদানগুলো অপরিহার্য।
-
অঙ্গভঙ্গি ঠিক রাখা: বসার সময় বা দাঁড়ানোর সময় জয়েন্ট যেন অতিরিক্ত প্রসারিত (Locking joints) না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
-
পর্যাপ্ত বিশ্রাম: শরীরকে রিকভারি করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিন।
হাইপারমোবিলিটি মানেই রোগ নয়, তবে এটি যখন ব্যথার কারণ হয়, তখন তা সিন্ড্রোম। ৬ মাস আগের এই ৬টি লক্ষণ অবহেলা করলে পরবর্তীতে জয়েন্ট ডিসলোকেশন বা অকাল আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি থেকে যায়। সচেতনতা এবং সঠিক ফিজিওথেরাপি এই সমস্যার সবচেয়ে বড় সমাধান।
