x
d o c t o r s 2 4
08 Aug

প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অনেক দম্পতি দ্বিতীয় সন্তান ধারণের চেষ্টায় ব্যর্থ হন, যা সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্ব নামে পরিচিত। এই সমস্যা পুরুষ, নারী বা উভয়ের মধ্যে হতে পারে এবং বিশেষ করে ২৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। প্রথমবার গর্ভধারণে সফলতা থাকলেও, দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের ক্ষেত্রে অনেকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন। এই নিবন্ধে আমরা জানবো সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্বের কারণ, এর প্রভাব এবং সমাধানের উপায় সম্পর্কে।

সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্ব কী এবং এর কারণ কী?

সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্ব হলো প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার পর দ্বিতীয়বার গর্ভধারণে অক্ষমতা। এটি পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যেই হতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে এই সমস্যা পুরুষদের মধ্যে এবং এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে নারীদের মধ্যে দেখা যায়। বাকি ক্ষেত্রে উভয়ের সম্মিলিত সমস্যা দায়ী হতে পারে। নিম্নলিখিত কারণগুলো সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী হতে পারে:

নারীদের ক্ষেত্রে কারণ:

  • পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিসিওএস): এটি নারীদের বন্ধ্যাত্বের একটি প্রধান কারণ। পিসিওএস-এ ডিম্বস্ফোটন (ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গমন) অনিয়মিত হয়, যা গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করে।
  • এন্ডোমেট্রিওসিস: জরায়ুর আস্তরণের টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পেলে এন্ডোমেট্রিওসিস হয়। এটি প্রদাহ এবং দাগ টিস্যু সৃষ্টি করে, যা ডিমের গুণমান খারাপ করে এবং শুক্রাণুর জন্য ডিমে পৌঁছানো কঠিন করে।
  • বয়সজনিত কারণ: ৩৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ডিম্বাণুর উৎপাদন এবং গুণমান কমে যায়, যা গর্ভধারণের সম্ভাবনা হ্রাস করে।
  • ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা: সংক্রমণ, পেলভিক প্রদাহজনিত রোগ বা অতীতের অস্ত্রোপচারের কারণে ফ্যালোপিয়ান টিউবে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যা নিষিক্ত ডিম্বাণুকে জরায়ুতে পৌঁছাতে বাধা দেয়।
  • হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: হাইপোথ্যালামাস এবং পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যার কারণে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে ডিম্বস্ফোটন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
  • সিজারিয়ান সেকশনের দাগ: পূর্ববর্তী সিজারিয়ান ডেলিভারির কারণে জরায়ুতে দাগ (ইসথমোসেল) তৈরি হতে পারে, যা গর্ভধারণে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
  • ইমিউন সিস্টেমের সমস্যা: হাশিমোটোর থাইরয়েডাইটিস, লুপাস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগ প্রজনন টিস্যুতে প্রদাহ সৃষ্টি করে উর্বরতা কমাতে পারে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে কারণ:

  • টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়া: বয়স, ডায়াবেটিস, যক্ষ্মা বা ইউরোলজিক্যাল আঘাতের কারণে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে শুক্রাণু উৎপাদন হ্রাস পায়।
  • টেস্টিকুলার ভ্যারিকোসিল: অণ্ডকোষে শিরা বড় হয়ে গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা শুক্রাণুর গুণমান ও উৎপাদন কমায়। এটি পুরুষ বন্ধ্যাত্বের প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে দায়ী।
  • বীর্যের গুণমান হ্রাস: ৪০ বছরের বেশি বয়সে বীর্যের গুণমান কমে যায়, যা গর্ভধারণের সম্ভাবনা হ্রাস করে।
  • প্রোস্টেট সমস্যা: বর্ধিত প্রোস্টেট শুক্রাণু নির্গমনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্বের নির্ণয় ও চিকিৎসা

সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে উঠতে প্রথমে এর কারণ নির্ণয় করা জরুরি। চিকিৎসক নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো সুপারিশ করতে পারেন:

  • রক্ত পরীক্ষা: হরমোনের মাত্রা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা।
  • ফ্যালোপিয়ান টিউবের এক্স-রে (হিস্টেরোসালপিনগোগ্রাম): টিউবে বাধা আছে কিনা তা জানতে।
  • ডিম্বস্ফোটন পরীক্ষা: ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা পরীক্ষা।
  • পেলভিক আল্ট্রাসাউন্ড: জরায়ু বা ডিম্বাশয়ের সমস্যা চিহ্নিত করতে।
  • পুরুষদের জন্য শুক্রাণু বিশ্লেষণ: শুক্রাণুর গুণমান ও পরিমাণ পরীক্ষা।

চিকিৎসার বিকল্প:

  • ওষুধ:
    • হরমোন-নিয়ন্ত্রক ওষুধ ডিম্বস্ফোটন প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করতে পারে।
    • পিসিওএস-এর ক্ষেত্রে ওষুধের পাশাপাশি জীবনধারা পরিবর্তন, যেমন ওজন নিয়ন্ত্রণ, সুপারিশ করা হয়।
  • অস্ত্রোপচার:
    • জরায়ু ফাইব্রয়েড, এন্ডোমেট্রিওসিস বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের বাধা দূর করতে অস্ত্রোপচার কার্যকর।
    • ন্যূনতম আক্রমণাত্মক অস্ত্রোপচার (যেমন ল্যাপারোস্কোপি) দ্রুত পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করে।
  • সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (ART):
    • ইন্ট্রাউটেরিন ইনসেমিনেশন (IUI) বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায়।
  • জীবনধারা পরিবর্তন:
    • সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ কমানো উর্বরতা উন্নত করতে পারে।
    • ধূমপান, অ্যালকোহল এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন।

প্রথমবার গর্ভধারণে সফলতা থাকলেও, দ্বিতীয়বার গর্ভধারণে সমস্যা হওয়া মানসিক ও শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এটি দম্পতিদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি করতে পারে। তবে, সঠিক নির্ণয় এবং চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। যদি আপনি এক বছরের বেশি সময় ধরে দ্বিতীয় সন্তান ধারণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন (বা ৩৫ বছরের বেশি বয়সে ছয় মাসের বেশি), তবে একজন ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

Leave A Comment