বাংলাদেশে প্রতিদিন ৫৬২ জন হৃদরোগে মারা যান, যার মধ্যে ৫২% মৃত্যুর জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। প্রতি বছর ২ লাখ ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ হৃদরোগে প্রাণ হারান, এবং ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ জন জন্মগত হৃদরোগে ভুগছেন। মাঝরাতে হঠাৎ বুকের ব্যথা, চাপ বা শ্বাসকষ্ট হলে কী করবেন? এটা কি হার্ট অ্যাটাক, নাকি গ্যাস্ট্রিক? সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবেন এবং কখন হাসপাতালে ছুটতে হবে? এই নিবন্ধে আমরা হৃদরোগ ও গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ এবং প্রাথমিক করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানাব।
হৃদরোগের লক্ষণ: হার্ট অ্যাটাক চিনুন
হৃদরোগের লক্ষণগুলো প্রায়ই বিভ্রান্তিকর হতে পারে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ দেওয়া হলো, যা হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা নির্দেশ করে:
- বুকে তীব্র চাপ বা ব্যথা: বুক যেন চেপে ধরেছে, বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এটি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।
- বারবার উঠে বসা: বুকের চাপের কারণে রোগী শুয়ে থাকতে পারেন না, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। বসে থাকলে কিছুটা স্বস্তি লাগে।
- শ্বাসকষ্ট: নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বা দম বন্ধ হয়ে আসছে—এটি হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বাড়ায়।
- বাইরে যাওয়ার প্রবৃত্তি: রোগী ঘরের দরজা-জানালা খুলতে চান বা বাইরে যেতে চান। এটি হার্ট অ্যাটাক, হাঁপানি বা উচ্চ রক্তচাপের কারণে হতে পারে।
- বাম বাহুতে ব্যথা: বুকের ব্যথা বাম বাহুতে ছড়িয়ে পড়লে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
- মানসিক চাপ: দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা, ব্যবসায়িক ক্ষতি, পারিবারিক সমস্যা বা স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর বুকের ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের ইঙ্গিত দিতে পারে।
- ঝুঁকিপূর্ণ রোগী: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা ধূমপানের ইতিহাস থাকলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে।
- শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও স্থূলতা: নিয়মিত ব্যায়াম না করা বা অতিরিক্ত ওজন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
- ঔষধে সাড়া না দেওয়া: এন্টাসিড, এলজিন বা সেকলোর মতো গ্যাস্ট্রিকের ওষুধে ব্যথা না কমলে এবং আধশোয়া অবস্থায় স্বস্তি মিললে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেশি।
- পূর্বের শ্বাসকষ্ট: সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হাঁপিয়ে ওঠা বা বুকে চাপ অনুভব হলে এটি হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ: কীভাবে চিনবেন?
গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণগুলো হৃদরোগের সঙ্গে মিলে যেতে পারে, তবে কিছু পার্থক্য রয়েছে:
- অতিরিক্ত ঝাল বা ভাজা খাবার: রাতে ঝাল, মরিচ, ভর্তা বা ভাজা খাবার খেলে গ্যাস্ট্রিকের সম্ভাবনা বেশি।
- কোষ্ঠকাঠিন্য: দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে বুকে ব্যথা গ্যাস্ট্রিকের কারণে হতে পারে।
- পেট ভরা ভাব: অল্প খাবারে পেট ভরে যাওয়া, গলায় খাবার আটকে থাকার অনুভূতি বা খাবার নিচে না নামা গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ।
- “খিল ধরা” অনুভূতি: বুকে “খিল” লেগে থাকা বা সামনে ঝুঁকতে না পারা গ্যাস্ট্রিকের ইঙ্গিত দেয়।
- পিঠে ব্যথা: বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলে রোগীরা বলেন, “সুনপুটি বিষায়ছে,” অর্থাৎ পিঠে ব্যথা, যা গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ হতে পারে।
হৃদরোগ বা গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নিচে কিছু পরামর্শ দেওয়া হলো:
- তাৎক্ষণিক হাসপাতালে যান: হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
- প্রাথমিক চিকিৎসা:
- সম্ভব হলে রোগীকে Tab. Angist SR 2.6mg খাওয়ান বা Nitromint Inhaler ব্যবহার করুন।
- অক্সিজেন সরবরাহ করুন, যদি পাওয়া যায়।
- অক্সিজেনযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন এবং রোগীকে আধশোয়া অবস্থায় রাখুন। মাথার নিচে দুটি বালিশ দিন।
- চিকিৎসকদের জন্য পরামর্শ:
- গ্যাস্ট্রিকের রোগীকে ভুল করে হার্ট অ্যাটাক মনে করা বড় ক্ষতি নয়।
- তবে হার্ট অ্যাটাকের রোগীকে গ্যাস্ট্রিক ভেবে ভুল চিকিৎসা দেওয়া মারাত্মক ভুল।
- প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন, ধূমপান ত্যাগ করুন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন।
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান বা শিথিলকরণ কৌশল ব্যবহার করুন।
হৃদরোগ বা গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রতি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানো জীবন বাঁচাতে পারে। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন!
লেখক:
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর
কমিউনিটি মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ
প্রাইম মেডিকেল কলেজ, রংপুর
