বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই ভুলে যাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা চিন্তাশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। কিন্তু যখন এই পরিবর্তনগুলো ক্রমে দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন তা হতে পারে অ্যালজাইমারস রোগের প্রাথমিক ইঙ্গিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালজাইমারস হঠাৎ হয় না—এর আগে শরীরে ও মস্তিষ্কে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দেয়, যা সাধারণত রোগ প্রকাশের প্রায় এক বছর আগেই শুরু হয়।
এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনে রাখা গেলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করে মস্তিষ্কের অবনতি রোধ করা সম্ভব। নিচে অ্যালজাইমারসের আগাম ৫টি সতর্ক সংকেত তুলে ধরা হলো—
১. স্মৃতিভ্রংশ বা হঠাৎ ভুলে যাওয়া
অ্যালজাইমারসের সবচেয়ে সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ হলো স্মৃতিভ্রংশ। রোগ শুরুর আগে মানুষ সাম্প্রতিক ঘটনা বা কথাবার্তা ভুলে যেতে শুরু করে। যেমন—
- সদ্য শোনা তথ্য মনে রাখতে না পারা
- জিনিস কোথায় রেখেছেন তা ভুলে যাওয়া
- একই প্রশ্ন বারবার করা
প্রথমে এটি সাধারণ ভুলের মতো মনে হলেও সময়ের সাথে তা বেড়ে যায় এবং কর্মজীবন ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে।
২. কথাবার্তায় অসংগতি বা শব্দ খুঁজে না পাওয়া
অ্যালজাইমারসের এক বছর আগে অনেকের ভাষাগত সমস্যা দেখা দেয়। কথা বলতে গিয়ে সাধারণ শব্দ খুঁজে না পাওয়া, বাক্য সম্পূর্ণ করতে না পারা, বা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা এর মধ্যে পড়ে। কখনো কখনো রোগীরা পরিচিত মানুষ বা বস্তুর নাম ভুলে যান, যা পরিবারকে চিন্তিত করে তোলে।
৩. দিকনির্দেশনা ও সময় নিয়ে বিভ্রান্তি
অ্যালজাইমারসের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীরা সময় ও স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। যেমন—
- পরিচিত রাস্তা ভুলে যাওয়া
- কোথায় যাচ্ছেন বা কেন গেছেন তা মনে না থাকা
- দিন, তারিখ বা সময় গুলিয়ে ফেলা
এই লক্ষণ সাধারণত রোগ প্রকাশের ৬ থেকে ১২ মাস আগে থেকেই শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে আরও জটিল হয়ে ওঠে।
৪. আচরণ ও মেজাজে পরিবর্তন
রোগের প্রাথমিক ধাপেই মস্তিষ্কের আবেগ-নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র প্রভাবিত হয়। ফলে মানুষ হঠাৎ রেগে যাওয়া, বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা বা উদ্বেগে ভুগতে পারেন। আগে সামাজিক ও প্রাণবন্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে একাকী ও উদাসীন হয়ে পড়েন। এমন পরিবর্তন দেখা দিলে তা কেবল মানসিক চাপ নয়, বরং অ্যালজাইমারসের আগাম সংকেত হতে পারে।
৫. সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মনোযোগে দুর্বলতা
অ্যালজাইমারসের আগে মানুষ দৈনন্দিন ছোট সিদ্ধান্ত নিতেও কষ্ট অনুভব করেন—
- বিল পরিশোধ ভুলে যাওয়া
- অপ্রয়োজনীয় খরচ করা
- রান্না বা অফিসের কাজ সম্পন্ন করতে না পারা
মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা ও সহজ কাজগুলোতেও বারবার ভুল করা মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যাওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
নিউরোলজিস্টদের মতে, অ্যালজাইমারস প্রতিরোধে প্রাথমিক সনাক্তকরণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যারা ৫০ বছরের বেশি বয়সী, তাদের স্মৃতিশক্তি বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে নিউরোলজিক্যাল চেকআপ করা উচিত।
রোগের ঝুঁকি কমাতে যা করবেন—
- নিয়মিত মানসিক ব্যায়াম (পাজল, পড়াশোনা, মেমরি গেম)
- পর্যাপ্ত ঘুম
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট উপকারী)
- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ
- সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা
অ্যালজাইমারস রোগ মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তোলে, তবে সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করলে রোগের অগ্রগতি কমানো সম্ভব। তাই ভুলে যাওয়া বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
