অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) একটি স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থা, যা শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, ভাষা এবং আচরণগত বিকাশে প্রভাব ফেলে। সাধারণত ২ থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে—এর অন্তত দুই বছর আগেই শরীরে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দেয়, যা ভবিষ্যতে অটিজমের ইঙ্গিত হতে পারে।
এই প্রাথমিক সংকেতগুলো যদি অভিভাবক বা চিকিৎসকরা সময়মতো শনাক্ত করতে পারেন, তবে শিশুর বিকাশে আগাম থেরাপি ও যত্ন নেওয়া সম্ভব, যা ভবিষ্যতের জীবনমানকে অনেক উন্নত করতে পারে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অটিজম শনাক্ত হওয়ার আগে শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কে কিছু বিশেষ জৈব পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনগুলো প্রায় ১৮ থেকে ২৪ মাস আগে থেকেই দেখা যেতে শুরু করে।
গবেষকরা বলেছেন, এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো কেবল আচরণে নয়, বরং ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, চোখের দৃষ্টি ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়াতেও প্রতিফলিত হয়।
অটিজমের ২ বছর আগে যে ৮টি লক্ষণ দেখা দিতে পারে
১. চোখে চোখ না রাখা বা কম দৃষ্টিসংযোগ:
সাধারণত শিশুরা ছয় মাস বয়স থেকেই মায়ের মুখ বা চোখের দিকে তাকাতে শুরু করে। কিন্তু ভবিষ্যতে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে এই দৃষ্টিসংযোগের আগ্রহ কমে যায়। এটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সংকেত।
২. হাসি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার অভাব:
৯–১২ মাস বয়সে শিশু সাধারণত হাসি, হাত নাড়ানো বা চেনা মুখ দেখে আনন্দ প্রকাশ করে। যদি এই প্রতিক্রিয়া অনুপস্থিত থাকে বা খুব সীমিত দেখা যায়, তা অটিজমের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।
৩. ভাষা বিকাশে ধীরগতি বা থেমে যাওয়া:
অনেক শিশু প্রথম দিকে কিছু শব্দ বলতে শুরু করে, কিন্তু পরে সেই শব্দগুলো ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়। এটি ভাষাগত বিকাশে “রিগ্রেশন” বা পিছিয়ে যাওয়া নির্দেশ করে, যা অটিজমের একটি প্রধান পূর্বলক্ষণ।
৪. একঘেয়ে বা পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ:
হাত নাড়ানো, কোনো বস্তুকে ঘোরানো, বা একই শব্দ বারবার বলা—এসব আচরণ শিশুর মধ্যে দুই বছর আগেই দেখা যেতে পারে। এটি মস্তিষ্কের সেন্সরি ইনপুট প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাতের লক্ষণ।
৫. ঘুম ও খাওয়ার অনিয়ম:
গবেষণায় দেখা গেছে, অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা জন্মের পর থেকেই ঘুমের ব্যাঘাত বা খাওয়া নিয়ে অস্বাভাবিকতা দেখায়। যেমন: রাতে অতিরিক্ত কান্না, ঘুম ভেঙে যাওয়া বা নির্দিষ্ট খাবারে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
৬. অতিসংবেদনশীলতা বা সংবেদনশীলতার অভাব:
কিছু শিশু হঠাৎ শব্দ, আলো বা স্পর্শে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়, আবার কেউ একেবারেই প্রতিক্রিয়াহীন থাকে। এটি স্নায়ুতন্ত্রের সংবেদনশীল ভারসাম্যের অভাব নির্দেশ করে।
৭. মুখাবয়ব ও অভিব্যক্তির অস্বাভাবিকতা:
অটিজমের আগাম পর্যায়ে শিশুর মুখের অভিব্যক্তি প্রায়শই নির্লিপ্ত থাকে বা হাসি, বিস্ময় বা কষ্ট প্রকাশের স্বাভাবিকতা দেখা যায় না। এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের বিকাশে ব্যাঘাতের ইঙ্গিত।
৮. সামাজিক খেলায় অনাগ্রহ:
অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা বা চোখে চোখ রেখে প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগ্রহ না থাকাও একটি বড় সতর্ক সংকেত। শিশুটি নিজের মতো খেলতে চায় বা খেলনা নির্দিষ্টভাবে সাজিয়ে রাখে।
নতুন প্রযুক্তি, যেমন Eye-Tracking AI System এবং Genetic Biomarker Test, এখন শিশুদের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক অটিজম শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে দুই বছর আগেই নির্ভুলভাবে ঝুঁকি নির্ধারণ সম্ভব হতে পারে।
অটিজম কোনো রোগ নয়—এটি এক ভিন্ন বিকাশধারা। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে শিশুর শেখার ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানো সম্ভব।
