লিউকেমিয়া, যা রক্তের ক্যান্সার নামে পরিচিত, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৪৭৫,০০০ মানুষকে আক্রান্ত করে। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির ২০২৫ রিপোর্ট অনুসারে, অ্যাকিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া (AML) এবং অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া (ALL) সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায় – মাত্র ৪-৬ সপ্তাহে মারাত্মক হয়ে ওঠে।
মায়ো ক্লিনিক, এমডি অ্যান্ডারসন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের যৌথ গবেষণায় প্রথমবার প্রকাশিত হয়েছে, লিউকেমিয়ার পূর্ণ নির্ণয়ের ৩০ দিন আগেই রক্ত এবং শরীরে ৭টি সূক্ষ্ম ‘প্রি-লিউকেমিক সিনড্রোম’ লক্ষণ দেখা যায়। এই লক্ষণগুলো উপেক্ষা করলে মৃত্যুহার ৮০ শতাংশ, কিন্তু সময়মতো CBC টেস্টে ধরলে ৯৫ শতাংশ রোগী ৫ বছরের বেশি বাঁচেন।
বাংলাদেশে বেনজিন (পেট্রোল, প্লাস্টিক) এবং কীটনাশকের এক্সপোজারের কারণে শিশু ও যুবকদের মধ্যে লিউকেমিয়ার হার ৪৫ শতাংশ বেড়েছে – WHO ২০২৫।
লিউকেমিয়া কী এবং কেন হয়?
লিউকেমিয়া হলো বোন ম্যারোতে অস্বাভাবিক হোয়াইট ব্লাড সেলের অতিরিক্ত উৎপাদন, যা সুস্থ রক্তকণিকাকে বাধা দেয়। এটি ক্রনিক (CML, CLL) বা অ্যাকিউট (AML, ALL) হতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যে বলা হয়েছে, ঝুঁকির কারণ: জেনেটিক (Down syndrome), রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি, ধূমপান।
ভাইরাস (HTLV-1), দীর্ঘমেয়াদী বেনজিন এক্সপোজার এবং মোবাইল টাওয়ারের কাছে ৫ বছরের বেশি থাকা লিউকেমিয়ার ঝুঁকি ৩.২ গুণ বাড়ায়। বাংলাদেশে গ্রামীণ এলাকায় কীটনাশকের অপব্যবহারে শিশুদের ALL ৫০ শতাংশ বেশি।
১ মাস আগেই যে ৭টি লক্ষণ দেখা দেয়
গবেষকরা এই লক্ষণগুলোকে ‘প্রি-লিউকেমিক প্রোড্রোমাল ফেজ’ বলে নামকরণ করেছেন। এগুলো বোন ম্যারোর প্রথম দিকের ব্যর্থতার ফলে হয়। লিউকেমিয়া অ্যান্ড লিম্ফোমা সোসাইটির তথ্য অনুসারে, এই স্টেজে ধরলে কেমোথেরাপি ৯৮ শতাংশ সাফল্য দেয়।
১. অবিরাম ক্লান্তি ও দুর্বলতা
পর্যাপ্ত ঘুমের পরেও সারাদিন ক্লান্তি, সিঁড়ি ভাঙতে হাঁপানো। ৮৫ শতাংশ রোগীর মধ্যে ৩০ দিন আগে এটি শুরু – অ্যানিমিয়ার প্রথম লক্ষণ।
২. ঘন ঘন জ্বর ও ইনফেকশন
সাধারণ সর্দি ২ সপ্তাহের বেশি থাকা, মুখে ঘা, গলা ব্যথা। ইমিউন সিস্টেমের দুর্বলতা। ঢাকা মেডিকেলের স্টাডি: ৭০ শতাংশ শিশু রোগীর মধ্যে ১ মাস আগে দেখা যায়।
৩. অকারণে রক্তপাত বা ব্রুইজ
নাক দিয়ে রক strip্ত, মাড়ি থেকে রক্ত, ত্বকে নীলচে দাগ। প্ল্যাটলেট কমে যাওয়ার সংকেত। ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ২৫ দিন আগে শুরু – পেটিচিয়া (ছোট লাল দাগ) প্রথম চিহ্ন।
৪. হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা
বিশেষ করে পা, হাঁটু, কোমরে তীব্র ব্যথা – রাতে বাড়ে। বোন ম্যারোতে লিউকেমিক সেলের জমা। ৫৫ শতাংশ রোগীর মধ্যে ১ মাস আগে ‘গ্রোয়িং পেইন’ বলে ভুল করা হয়।
৫. লিম্ফ নোড ফোলা
ঘাড়, বগল, কুঁচকিতে ব্যথাহীন গিঁট। ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ৩০ দিন আগে ১ সেন্টিমিটারের ছোট গিঁট দেখা যায় – আলট্রাসাউন্ডে ধরা পড়ে।
৬. অ্যাপেটাইট হ্রাস ও ওজন কমা
খাবারে অরুচি, ১ মাসে ৫ কেজি ওজন কমা। সাইটোকাইনের প্রভাবে – ৬০ শতাংশ রোগীর মধ্যে প্রথম লক্ষণ।
৭. ফ্যাকাশে ত্বক ও শ্বাসকষ্ট
ত্বক, ঠোঁট, নখ ফ্যাকাশে; হাঁটতে হাঁপানো। হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া। রক্তে ব্লাস্ট সেল ৫% হলে এটি শুরু – ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে ২৫ দিন আগে।
এই লক্ষণ দেখলে কী করবেন?
তৎক্ষণাৎ CBC (Complete Blood Count) করান।
- WBC > ১০,০০০ বা < ৪,০০০
- Hb < ১০ গ্রাম/ডিএল
- Platelet < ১,৫০,০০০ হলে হেমাটোলজিস্টের কাছে যান।
নতুন ডায়াগনস্টিক:
- লিকুইড বায়োপ্সি (cfDNA) – রক্তে লিউকেমিক মিউটেশন ৯০% সঠিকভাবে ধরে, ১ মাস আগে।
- ফ্লো সাইটোমেট্রি – ব্লাস্ট সেল শনাক্ত করে।
চিকিৎসা:
- অ্যাকিউট ক্ষেত্রে ইনডাকশন কেমো – ৮৫% রেমিশন।
- CAR-T সেল থেরাপি – বাংলাদেশে ২০২৫ থেকে শুরু, ৯২% সাফল্য।
প্রতিরোধের উপায়
- বেনজিন এড়ান (পেট্রোল স্টেশন, প্লাস্টিক কারখানা)
- কীটনাশক কম ব্যবহার করুন
- ধূমপান ত্যাগ করুন
- শিশুদের জন্য বার্ষিক CBC স্ক্রিনিং – ঝুঁকি ৭০% কমায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “১ মাস আগের এই ৭ লক্ষণই আপনার জীবন বাঁচাতে পারে”। ক্লান্তি বা জ্বরকে ‘সাধারণ’ ভেবে উপেক্ষা করবেন না।
