লিম্ফোমা — রক্ত ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার এক নীরব ঘাতক। এটি এমন এক ধরনের ক্যান্সার, যা লিম্ফাটিক সিস্টেমে (Lymphatic System) আক্রমণ করে; অর্থাৎ শরীরের প্রতিরোধক্ষমতার মূল অংশে। এই সিস্টেমটি শরীরকে সংক্রমণ ও রোগ থেকে রক্ষা করে, কিন্তু যখন এর কোষগুলোর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শুরু হয়, তখনই জন্ম নেয় লিম্ফোমা ক্যান্সার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে এবং এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ অসুস্থতা বা ক্লান্তির মতো মনে হতে পারে। কিন্তু সত্য হলো—এই ক্যান্সার শুরু হওয়ার ৪ মাস আগেই শরীর কিছু স্পষ্ট সংকেত দেয়, যা উপেক্ষা করলে তা প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
নিচে লিম্ফোমার প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা দিতে পারে এমন ৮টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ তুলে ধরা হলো—
১. ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে ফোলা গাঁট
লিম্ফোমার সবচেয়ে সাধারণ ও প্রথম লক্ষণ হলো লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া।
এই গাঁট সাধারণত ব্যথাহীন, কিন্তু ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
যদি আপনি ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে এমন গাঁট অনুভব করেন যা ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী থাকে, তবে এটি ক্যান্সারের প্রাথমিক সতর্ক সংকেত হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, শরীরের ভেতর লিম্ফ কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটলেই এই ফোলা দেখা দেয়।
২. অকারণ ক্লান্তি ও দুর্বলতা
লিম্ফোমা রক্তে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট করে, ফলে শরীর দ্রুত শক্তিহীন ও ক্লান্ত বোধ করে।
অনেকেই মনে করেন এটি কাজের চাপ বা ঘুমের অভাব, কিন্তু যদি বিশ্রাম নিলেও ক্লান্তি না কমে, তাহলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
৩. রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
লিম্ফোমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রাতে ঘাম হওয়া বা Night Sweats।
রাতে ঘুমের মধ্যে পুরো শরীর ভিজে যাওয়া, এমনকি পোশাক বা বিছানা ভিজে যাওয়া পর্যন্ত হতে পারে।
এই ঘাম আসলে শরীরের ইমিউন সিস্টেমের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার ফল, যা টিউমার কোষের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ঘটে।
৪. অকারণ জ্বর ও ঠান্ডা লাগা
লিম্ফোমা কোষ শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যার ফলে অস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর দেখা দেয়।
এই জ্বর প্রায়ই হালকা মাত্রার (১০০°F–১০১°F) হয় এবং বারবার ফিরে আসে।
যদি কোনো সংক্রমণ না থাকা সত্ত্বেও এমন জ্বর থাকে, তবে এটি হতে পারে লিম্ফোমার প্রাথমিক ইঙ্গিত।
৫. ওজন হ্রাস
চার মাসের মধ্যে অকারণে ৫ কেজির বেশি ওজন কমে যাওয়া লিম্ফোমার একটি বড় সতর্ক সংকেত।
কারণ, টিউমার কোষ শরীরের শক্তি ব্যবহার করে ফেলে, ফলে বিপাকীয় হার (metabolism) বেড়ে যায় এবং ওজন কমে যায়।
৬. চুলকানি বা ত্বকের জ্বালাপোড়া
লিম্ফোমা কোষ থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ (Cytokines) ত্বকে চুলকানি, লালচে ভাব বা ফুসকুড়ি সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষত হাত, পা বা শরীরের নিচের অংশে এই চুলকানি বেশি দেখা যায় এবং সাধারণ অ্যালার্জির ওষুধে সেরে ওঠে না।
৭. কাশি বা বুকের চাপ অনুভব
লিম্ফোমা যদি বুকে (Mediastinal Lymph Nodes) ছড়িয়ে পড়ে, তবে শ্বাস নিতে কষ্ট, হালকা বুক ব্যথা বা কাশি হতে পারে।
এই অবস্থায় অনেকেই এটিকে ঠান্ডা-কাশির সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন, কিন্তু এটি হতে পারে মিডিয়াস্টিনাল লিম্ফোমার প্রাথমিক ইঙ্গিত।
৮. ক্ষুধামান্দ্য ও হজমের সমস্যা
লিম্ফোমা শরীরের বিপাক ও হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে।
ফলে ক্ষুধা কমে যায়, পেটে অস্বস্তি বা বমিভাব দেখা দেয়, এমনকি সামান্য খাবার খেলেও পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি হতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ
- যদি উপরোক্ত লক্ষণগুলোর মধ্যে একাধিক ৩-৪ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে অবিলম্বে রক্ত পরীক্ষা, বায়োপসি বা সিটি স্ক্যান করানো উচিত।
- লিম্ফোমা দুই প্রকার—হজকিন (Hodgkin’s) ও নন-হজকিন (Non-Hodgkin’s)। উভয় প্রকারেই প্রাথমিক শনাক্ত হলে চিকিৎসা সফলতার হার ৮০ শতাংশের বেশি।
- চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি, যা এখন বাংলাদেশেও সফলভাবে দেওয়া হচ্ছে।
