অস্টিওআর্থ্রাইটিস—বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে সাধারণ জয়েন্ট রোগগুলোর একটি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্টিলেজ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে, ফলে হাঁটু, কোমর, হাত বা আঙুলের জয়েন্টে ব্যথা, কড়কড় শব্দ এবং চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগ হঠাৎ করে হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই ৪–৬ মাস আগে শরীর কিছু সংকেত পাঠাতে থাকে, যা সময়মতো বোঝা গেলে জয়েন্ট ক্ষয় কমানো বা ধীর করা সম্ভব।
নীচে অস্টিওআর্থ্রাইটিস শুরু হওয়ার ৬ মাস আগে শরীরে দেখা দিতে পারে এমন ৮টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ তুলে ধরা হলো—
১. সকালবেলা জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া (Morning stiffness)
অস্টিওআর্থ্রাইটিসের অন্যতম প্রাথমিক সংকেত হলো সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর জয়েন্ট শক্ত লাগা। সাধারণত ১০–১৫ মিনিটের মধ্যে এই শক্তভাব চলে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কার্টিলেজে প্রদাহের সূচনা হতে পারে, যা বাড়তে বাড়তে ভবিষ্যতে ব্যথা ও ক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়।
২. জয়েন্টে হালকা ব্যথা, বিশেষত বিকেলের দিকে
ছয় মাস আগেই অনেকের হাঁটু বা কোমরে ক্ষীণ ব্যথা দেখা দেয়। বেশি হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে এই ব্যথা বাড়ে।
এটিকে “লো–গ্রেড পেইন” বলা হয়, যেটি জয়েন্টের অভ্যন্তরীণ ঘর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ঘটে।
৩. চলাফেরায় কড়কড় বা ক্লিকিং শব্দ
হাঁটু বা হাত ভাঁজ করার সময় ‘টিক টিক’ বা ‘কড়কড়’ শব্দ শোনা গেলে তা কার্টিলেজ পাতলা হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। যদিও অনেকের ক্ষেত্রে এই শব্দ ক্ষতিকর নয়, তবে নিয়মিত হলে নজর দেওয়া জরুরি।
এটি সাইনোভিয়াল ফ্লুইডের ঘনত্ব কমে যাওয়ারও ইঙ্গিত হতে পারে।
৪. জয়েন্ট ফুলে যাওয়া বা হালকা গরম অনুভূত হওয়া
প্রাথমিক অস্টিওআর্থ্রাইটিসে প্রদাহ খুব বেশি থাকে না। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে জয়েন্টের চারপাশ অল্প ফুলে যেতে পারে বা গরম অনুভূত হতে পারে।
এটি ভবিষ্যতে তীব্র ব্যথার পূর্বাভাস হিসেবে কাজ করে।
৫. দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে অস্বস্তি
কাজের জায়গায় বা বাজারে দাঁড়ানোর সময় হাঁটুর ওপর বাড়তি চাপ পড়লে কার্টিলেজের ক্ষতি বেশি প্রকাশ পেতে শুরু করে। তখন অনেকে শুরুতে ব্যথা না পেলেও টানটান অনুভূতি বা অস্বস্তি টের পান।
ছয় মাস আগেই এই পরিবর্তন জয়েন্টের শক্তি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
৬. জয়েন্টের নড়াচড়া সীমিত হওয়া
হাঁটু পুরোপুরি ভাঁজ করতে কষ্ট, হাত তুলতে সমস্যা বা কোমর ঘোরাতে ব্যথা—এসবই গতিশীলতা কমে যাওয়ার লক্ষণ।
কার্টিলেজ ক্ষয় শুরু হলে জয়েন্টের ভেতরের গঠন পরিবর্তিত হয়, ফলে নড়াচড়ার স্বাভাবিক পরিসর কমতে থাকে।
৭. আবহাওয়া পরিবর্তনে ব্যথা বেড়ে যাওয়া
অনেক অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোগী জানিয়েছেন—বর্ষা, আর্দ্রতা বা ঠান্ডা পড়লে ব্যথা বা জড়তা আগেই বেড়ে যায়।
গবেষকরা ধারণা করেন, আবহাওয়ার চাপ পরিবর্তন টিস্যুর তরলে প্রভাব ফেলে, যা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের পূর্বলক্ষণকে আরও স্পষ্ট করে।
৮. জয়েন্টে চাপ থাকা অবস্থায় দুর্বলতা ও ক্লান্তি
সিঁড়ি ভাঙতে গেলে হাঁটু কেঁপে যাওয়া, হাত দিয়ে জিনিস তুলতে গেলে দুর্বল লাগা—এগুলোও ভবিষ্যৎ অস্টিওআর্থ্রাইটিসের পূর্বসতর্কতা হতে পারে।
কারণ জয়েন্টের পেশিগুলো তখন অতিরিক্ত চাপ সামলাতে পারে না।
কী করবেন?
- চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজন হলে এক্স-রে বা এমআরআই করাতে পারেন।
- দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
- হাঁটা, সাইক্লিং বা সুইমিংয়ের মতো লো-ইমপ্যাক্ট ব্যায়াম জয়েন্টকে রক্ষা করে।
- ওমেগা–৩, ভিটামিন ডি, কোলাজেন এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খেলে উপকার পাওয়া যায়।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস অনেক সময় নিঃশব্দে শুরু হয়। তাই শরীরের এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোর দিকে নজর রাখা জরুরি।
