শীতকাল এলেই শিশুদের ডায়রিয়ার প্রকোপ হঠাৎ বেড়ে যায়—এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও গবেষণায় নিয়মিতই দেখা যায়। গরমের তুলনায় শীতে ডায়রিয়া কম হবে—এ ধারণা অনেকের থাকলেও বাস্তবে এর বিপরীত ঘটে। বিশেষ করে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে শীতকালীন ডায়রিয়ার সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়।
সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, শীতে ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া ৪০–৬০% পর্যন্ত বাড়ে, যার মধ্যে রোটাভাইরাসই প্রধান কারণ।
শীতের সময় বাতাস ঠান্ডা হওয়ায় অনেক ভাইরাস টিকে থাকতে বেশি অনুকূল পরিবেশ পায়। রোটাভাইরাস শীতেই সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায় এবং দীর্ঘ সময় পৃষ্ঠতলে জীবিত থাকে।
বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, শীতে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রায় ৬০ শতাংশই রোটাভাইরাসজনিত। এজন্য শীতকালকে বিশেষজ্ঞরা “রোটাভাইরাস সিজন” বলেও উল্লেখ করেন।
শীতের ডায়রিয়া বাড়ার প্রধান কারণ
১) ভাইরাসের সক্রিয়তা বৃদ্ধি: ঠান্ডা ও শুকনো আবহাওয়ায় রোটাভাইরাস ও নোরোভাইরাস দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে।
২) হাত ধোয়ার অভ্যাস কমে যাওয়া: শীতে ঠান্ডার কারণে শিশুরা ও অভিভাবকরা হাত ধোয়ার বিষয়ে একটু অলস হয়ে পড়েন।
৩) দূষিত পানি ও খাবার: শীতে অনেক পরিবার কম পানি ফুটিয়ে খায়, আবার খাবার ঠান্ডা হয়ে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর সুযোগ বেশি থাকে।
৪) বন্ধ ঘরে বেশি সময় থাকা: ভাইরাস ছড়ানোর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়।
৫) ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হওয়া: গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে শিশুদের রোগ প্রতিরোধশক্তি ১০–১৫% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
শীতের ডায়রিয়ার নতুন লক্ষণ—যা অভিভাবকদের জানা জরুরি
– বমি শুরু হওয়া
– হঠাৎ পানি শূন্যতার লক্ষণ
– ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া
– বারবার পাতলা পায়খানা
– জ্বর ও পেটের মুচড়ানো ব্যথা
– শিশু অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়া
ডাক্তাররা সতর্ক করেন—শীতের ডায়রিয়ায় ডিহাইড্রেশন খুব দ্রুত হয়। তাই শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলেই চিকিৎসা নিতে হবে।
শীতের ডায়রিয়া প্রতিরোধে করণীয়—বিশেষজ্ঞদের ১২টি পরামর্শ
১) রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ ভ্যাকসিন ডায়রিয়ার গুরুতর মাত্রা ৮৫% পর্যন্ত কমাতে সক্ষম। বাংলাদেশে এখন এটি সহজলভ্য।
২) হাত ধোয়ার কড়া নিয়ম:
– বাইরে থেকে এসে
– খাবার খাওয়ার আগে
– টয়লেট ব্যবহারের পর
– শিশুকে খাওয়ানোর আগে
– সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড
৩) পানির নিরাপত্তা:
– শিশুদের জন্য সবসময় ফুটানো পানি
– বোতলজাত পানি ব্যবহার করলে অবশ্যই সিল পরীক্ষা করে নিন
– ঠান্ডা খাবার শিশুকে না দেওয়া
৪) ঘরের বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন: রোটাভাইরাস বদ্ধ ঘরে বেশি ছড়ায়।
৫) খাবার গরম রাখা: ঠান্ডা খাবারে দ্রুত জীবাণু জন্মায়।
৬) দুধ খাওয়ানো শিশুদের বিশেষ যত্ন: দুধের বোতল, নিপল, চামচ—সবকিছু দিনে অন্তত একবার ফুটিয়ে নিন।
৭) শিশুর হাত পরিষ্কার রাখা: অনেক শিশুই ঠান্ডায় হাত ধোয়া এড়িয়ে যায়। গরম পানি ব্যবহার করুন।
৮) বাইরের খাবার কমানো: শীতে রাস্তার খাবারে দূষণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৯) ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে ওআরএস: পাতলা পায়খানা শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে ওআরএস খাওয়াতে হবে।
১০) প্রোবায়োটিক ব্যবহার: নতুন গবেষণা বলছে—প্রোবায়োটিক শিশুদের গাট হেলথ ভালো রাখে এবং ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমায়। (ডাক্তার দেখিয়ে ব্যবহার করা উচিত)
১১) শিশুকে উষ্ণ এবং পরিষ্কার পরিবেশে রাখা: ঠান্ডা লাগলে ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
১২) অতিরিক্ত জনসমাগম এড়ানো: ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
– শিশু বার বার বমি করলে
– চোখ ও মুখ শুকিয়ে গেলে
– প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে
– জ্বর ২৪ ঘণ্টার বেশি থাকলে
– শিশু অস্বাভাবিকভাবে দুর্বল হয়ে গেলে
শীতকালীন ডায়রিয়া একটি প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা—তবে সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং রোটাভাইরাস টিকার নিয়মিত ব্যবহারই পারে শিশুদের এই বিপদ থেকে নিরাপদ রাখতে। অভিভাবকদের এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি, কারণ শীতের শুরুতেই ভাইরাসের সক্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে।
সঠিক পরিচর্যা ও ত্বরিত ব্যবস্থা নিলে শীতের এই ডায়রিয়া সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব—শিশু থাকবে সুস্থ, শীত হবে নিরাপদ।
