x
d o c t o r s 2 4
29 Dec

চাইল্ডহুড অবেসিটি বা শিশুদের স্থূলতা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। অনেক অভিভাবকই মনে করেন, শিশুর ওজন হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। কিন্তু শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থূলতা দেখা দেওয়ার অন্তত ১ বছর আগেই শিশুর শরীর ও আচরণে কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন শুরু হয়। এসব আগাম লক্ষণ শনাক্ত করা গেলে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয় এবং ভবিষ্যতের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।

প্রথম লক্ষণ হলো দ্রুত ও অস্বাভাবিক ক্ষুধা বৃদ্ধি। শিশু যদি বারবার খাবার চায়, বিশেষ করে মিষ্টি বা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়, তাহলে সেটি হরমোনাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, লেপটিন ও ইনসুলিন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে শিশুর ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়—যা স্থূলতার প্রাথমিক ধাপ।

দ্বিতীয় লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় দৈহিক কার্যকলাপের আগ্রহ কমে যাওয়া। আগে যে শিশু খেলাধুলায় সক্রিয় ছিল, সে যদি ধীরে ধীরে ঘরে বসে থাকতে পছন্দ করে, দৌড়ঝাঁপে আগ্রহ হারায় বা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তা বিপাকীয় পরিবর্তনের আগাম সংকেত হতে পারে।

তৃতীয় লক্ষণ হলো ঘুমের ধরনে পরিবর্তন। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে রাতে দেরিতে ঘুমানো, ঘুমের সময় শ্বাসকষ্ট বা নাক ডাকা বেড়ে যাওয়া দেখা যায়। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম না হলে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়, যা শরীরে অতিরিক্ত ফ্যাট জমাতে সহায়তা করে—এ তথ্যটি এখন নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

চতুর্থ লক্ষণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন পেট ও কোমরের চারপাশে চর্বি জমার সূচনা। ওজন তখনো খুব বেশি না বাড়লেও শরীরের গঠনে এই পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে। ভিসেরাল ফ্যাট বাড়া ভবিষ্যতের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের বড় ইঙ্গিত।

পঞ্চম লক্ষণ হলো ত্বকের কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন, যেমন ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে কালচে দাগ (Acanthosis Nigricans)। এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের একটি পরিচিত আগাম চিহ্ন, যা শিশুদের স্থূলতার আগেই দেখা দিতে পারে।

ষষ্ঠ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয় মুড সুইং ও আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া। শিশু হঠাৎ রাগী হয়ে উঠতে পারে, নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করতে পারে বা সামাজিক কার্যকলাপ এড়িয়ে চলতে পারে। মানসিক চাপ আবার খাওয়ার অভ্যাসকে আরও খারাপ করে তোলে—একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়।

সপ্তম লক্ষণ হলো বারবার অসুস্থ হওয়া ও সংক্রমণ প্রবণতা বৃদ্ধি। গবেষণায় দেখা গেছে, বিপাকীয় পরিবর্তনের শুরুতেই ইমিউন সিস্টেম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে শিশু সহজেই সর্দি-কাশি বা অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হয়।

অষ্টম ও শেষ লক্ষণটি হলো পরিবারে স্থূলতা ও লাইফস্টাইলের প্রভাব। যদিও এটি সরাসরি শারীরিক লক্ষণ নয়, তবে যদি পরিবারে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও কম শারীরিক কার্যকলাপ থাকে, তাহলে শিশুর শরীরে উপরোক্ত পরিবর্তনগুলো দ্রুত দেখা দিতে পারে।

নতুন তথ্য হিসেবে উল্লেখযোগ্য যে, আধুনিক পেডিয়াট্রিক গাইডলাইনে এখন BMI ছাড়াও কোমর-উচ্চতা অনুপাত, ঘুমের সময়কাল ও স্ক্রিন টাইমকে আগাম ঝুঁকি নির্ণয়ের সূচক হিসেবে ধরা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষণগুলো দেখা দিলেই ছোট ছোট পরিবর্তন—যেমন পারিবারিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার, প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট শারীরিক কার্যকলাপ এবং নিয়মিত ঘুম—শিশুকে স্থূলতার পথে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

Leave A Comment