x
d o c t o r s 2 4
16 Jan

জরায়ু বা ইউটেরাইন ক্যান্সার (Uterine Cancer) বর্তমানে নারীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি। আশার কথা হলো, এই ক্যান্সারটি সাধারণত শরীরের এমন কিছু সংকেত দেয় যা দেখলে অন্তত ৬ মাস আগেই সচেতন হওয়া সম্ভব। চিকিৎসকরা একে “সাইলেন্ট ওয়ার্নিং” বলে থাকেন। এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনতে পারলে আক্রান্ত ব্যক্তি সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিয়ে প্রায় ১০০ শতাংশ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।

ইউটেরাইন ক্যান্সার মূলত জরায়ুর ভেতরের স্তর (Endometrium) থেকে শুরু হয়। টিউমারটি বড় হওয়ার বেশ আগে থেকেই শরীর যে পরিবর্তনগুলো দেখাতে শুরু করে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. পিরিয়ডের ধরনে সূক্ষ্ম পরিবর্তন (Subtle Menstrual Changes)

মেনোপজ বা মাসিক বন্ধ হওয়ার আগে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে এটি প্রথম সংকেত। যদি দেখেন পিরিয়ডের সময় সাধারণের চেয়ে বেশি রক্তপাত হচ্ছে (Heavy bleeding) কিংবা মাসিক চক্রের মাঝখানে হঠাৎ হালকা রক্ত বা স্পটিং (Spotting) দেখা দিচ্ছে, তবে একে অবহেলা করবেন না। অনেকে একে সাধারণ হরমোনের সমস্যা মনে করেন, কিন্তু এটি ক্যান্সারের সুপ্ত লক্ষণ হতে পারে।

২. তলপেটে সার্বক্ষণিক ভারি বোধ বা মৃদু অস্বস্তি (Pelvic Pressure)

ক্যান্সার কোষগুলো যখন জরায়ুর দেয়ালে বিকশিত হতে শুরু করে, তখন তলপেটে এক ধরণের অস্বস্তি বা হালকা চাপ অনুভূত হতে পারে। এটি তীব্র ব্যথা নয়, বরং মনে হবে তলপেট সবসময় ফুলে আছে (Bloating) বা ভারি হয়ে আছে। যদি এই অস্বস্তি টানা কয়েক সপ্তাহ চলতে থাকে, তবে এটি জরায়ুর অভ্যন্তরে কোনো পরিবর্তনের সংকেত।

৩. রঙের পরিবর্তনহীন অস্বাভাবিক যোনি স্রাব (Watery Discharge)

রক্তপাতের আগে অনেক সময় শরীর পাতলা, জলীয় বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব নির্গত করতে পারে। সাধারণ ইনফেকশনের স্রাব থেকে এটি আলাদা কারণ এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিশেষ করে মেনোপজ হয়ে যাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরণের স্রাব বা সাদা পানি যাওয়া একটি বড় লাল সংকেত (Red Flag)।

৪. প্রস্রাব এবং মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন

জরায়ু যখন আয়তনে সামান্য বৃদ্ধি পায়, তখন তা মূত্রথলি বা মলাশয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে শুরু করে। এর ফলে ঘনঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়া, প্রস্রাব করার সময় মৃদু জ্বালাপোড়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় একে সাধারণ ইউটিআই (UTI) মনে করে ভুল করা হয়।

৫. কারণ ছাড়াই ক্লান্তি ও সামান্য ওজন হ্রাস

ক্যান্সার কোষগুলো শরীরের পুষ্টি ও শক্তি শোষণ করতে শুরু করে। ফলে কোনো ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই যদি ওজন কমতে শুরু করে এবং সবসময় শরীরে এক ধরণের অবসাদ বা ক্লান্তি অনুভূত হয়, তবে বুঝতে হবে শরীরের ভেতরে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে। এই ক্লান্তি সাধারণত পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও দূর হয় না।

বিশেষ সতর্কতা: মেনোপজের পরের রক্তপাত

মেনোপজ বা মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যদি এক ফোঁটা রক্তও দেখা দেয়, তবে সেটিকে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, পোস্ট-মেনোপজাল রক্তপাত হওয়া মহিলাদের মধ্যে অনেকেরই প্রাথমিক পর্যায়ে ইউটেরাইন ক্যান্সার ধরা পড়ে।

কেন ৬ মাস আগের সচেতনতা জরুরি?

ইউটেরাইন ক্যান্সার যদি প্রথম ধাপে শনাক্ত করা যায়, তবে শুধুমাত্র অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই এটি পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব। দেরি হয়ে গেলে ক্যান্সারটি লিম্ফ নোড বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, তখন চিকিৎসা অনেক জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

প্রতিরোধ ও করণীয়:

  • নিয়মিত চেকআপ: প্রতি বছর অন্তত একবার অভিজ্ঞ গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন এবং পেলভিক আল্ট্রাসাউন্ড করান।

  • ওজন নিয়ন্ত্রণ: স্থূলতা ইউটেরাইন ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।

  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: যাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি, তাদের এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণের চেয়ে বেশি থাকে।

আপনার শরীর আপনাকে সবসময় সংকেত দেয়, শুধু প্রয়োজন একটু সচেতন নজর। উপরোক্ত লক্ষণগুলো টানা ২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে কোনো দ্বিধা না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

Leave A Comment