x
d o c t o r s 2 4
21 Jan

সিকেল সেল ডিজিজ (Sickle Cell Disease) একটি বংশগত রক্তকণিকার রোগ, যেখানে লোহিত রক্তকণিকাগুলো গোল হওয়ার পরিবর্তে কাস্তের মতো (Sickle shape) বাঁকা হয়ে যায়। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো রক্তনালীতে আটকে গিয়ে অক্সিজেন প্রবাহে বাধা দেয়। সাধারণত জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই এই রোগ ডালপালা মেলতে শুরু করে। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে বড় ধরনের কোনো ‘ক্রাইসিস’ বা তীব্র ব্যথার সংকট দেখা দেওয়ার অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই শরীর বিশেষ কিছু সংকেত দিতে থাকে।

নিচে সিকেল সেল ডিজিজের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ আলোচনা করা হলো যা অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই রোগীর শরীরে দেখা দিতে শুরু করে।

সিকেল সেল অ্যানিমিয়া বা ডিজিজ শনাক্ত হওয়ার আগে রোগীরা প্রায়ই সাধারণ কিছু শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হন, যা মূলত রক্তের অভাব ও অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে ঘটে।

১. হাত ও পায়ের পাতায় অস্বাভাবিক ফোলা (Dactylitis)

এটি সিকেল সেলের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ, যা প্রায়ই ৬ মাস আগে থেকে অনিয়মিতভাবে দেখা দেয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে হাত ও পায়ের পাতা হঠাৎ ফুলে যায় এবং প্রচণ্ড ব্যথা হয়। রক্তনালীতে কাস্তে আকৃতির কোষগুলো আটকে যাওয়ার ফলে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে এই ফোলাভাব তৈরি হয়।

২. বারবার জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেওয়া (Episodes of Jaundice)

সিকেল সেলগুলো খুব দ্রুত ভেঙে যায় (সাধারণ কোষ ১২০ দিন বাঁচলেও এগুলো ১০-২০ দিন বাঁচে)। এই দ্রুত ভাঙনের ফলে রক্তে ‘বিলিরুবিন’ বেড়ে যায়। ফলে চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যায়। রোগী হয়তো ভাবেন এটি সাধারণ লিভারের সমস্যা, কিন্তু এটি আসলে ৬ মাস আগে থেকেই রক্তকণিকার অস্বাভাবিক ভাঙনের ইঙ্গিত দেয়।

৩. প্লীহা বা স্প্লিনের বৃদ্ধি (Splenic Sequestration)

পেটের বাম পাশের উপরের অংশ যদি শক্ত বা ফোলা মনে হয়, তবে তা প্লীহা বড় হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় অস্বাভাবিক রক্তকণিকাগুলো প্লীহায় আটকে গিয়ে একে বড় করে তোলে। এটি রক্তশূন্যতার একটি বড় কারণ এবং চূড়ান্ত সংকটের অনেক আগেই শরীর এই সংকেত দেয়।

৪. দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও ফ্যাকাসে ভাব (Severe Anemia)

পর্যাপ্ত লোহিত রক্তকণিকার অভাবে শরীর সবসময় অক্সিজেনের ঘাটতিতে থাকে। ফলে রোগী সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ফ্যাকাসে দেখায়। জিহ্বা, নখ এবং চোখের নিচের অংশ সাদাটে হয়ে যাওয়া এবং সামান্য নড়াচড়াতেই হাঁপিয়ে ওঠা নির্দেশ করে যে রক্তে লোহিত কণিকার সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

৫. দৃষ্টিশক্তিতে সূক্ষ্ম পরিবর্তন (Vision Changes)

সিকেল কোষগুলো চোখের ভেতরের সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। রোগ নির্ণয়ের প্রায় ৬ মাস আগে থেকেই রোগী ঝাপসা দেখা বা চোখের সামনে কালো বিন্দু দেখার মতো সমস্যায় ভুগতে পারেন। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

৬. বিলম্বিত বৃদ্ধি বা বয়ঃসন্ধি (Delayed Growth)

লোহিত রক্তকণিকা শরীরের বৃদ্ধি ও হরমোনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করে। যদি কোনো শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি তার বয়সী অন্য শিশুদের চেয়ে অনেক ধীর হয় বা বয়ঃসন্ধি আসতে দেরি হয়, তবে এটি সিকেল সেল ডিজিজের একটি দীর্ঘমেয়াদী পূর্বলক্ষণ হতে পারে।

৭. ঘন ঘন সংক্রমণ ও হালকা জ্বর (Recurrent Infections)

সিকেল সেল শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অক্ষম করে তোলে। বিশেষ করে প্লীহা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে নিউমোনিয়া বা ফ্লুর মতো রোগে রোগী বারবার আক্রান্ত হন। মাসে অন্তত একবার জ্বর বা ইনফেকশন হওয়া একটি সতর্ক সংকেত।

কেন ৬ মাস আগের সচেতনতা জরুরি?

সিকেল সেল ডিজিজ যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তাকে বলা হয় ‘ভ্যাসো-অক্লুসিভ ক্রাইসিস’। এই অবস্থায় হাড় ও অঙ্গে তীব্র ব্যথা শুরু হয় এবং অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ৬ মাস আগে যখন উপরের লক্ষণগুলো মৃদু আকারে দেখা দেয়, তখনই ‘হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস’ নামক রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি ধরা পড়লে সঠিক ব্যবস্থাপনা (যেমন- হাইড্রক্সিউরিয়া ওষুধ বা ফলিক অ্যাসিড) শুরু করা যায়। এটি দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা এবং অসহ্য ব্যথা থেকে রোগীকে মুক্তি দেয়।

স্ক্রিনিং-এর গুরুত্ব

বর্তমানে প্রাক-বিবাহ বা সন্তান নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বাবা-মা দুজনেই যদি সিকেল সেল ট্রেইট (বাহক) বহন করেন, তবে সন্তানের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২৫% বেড়ে যায়।

শরীরের ছোটখাটো ফোলা বা ফ্যাকাসে ভাবকে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্টের পরামর্শ নিন। দ্রুত শনাক্তকরণই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।

Leave A Comment