ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ (ILD) কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং এটি ১০০টিরও বেশি ফুসফুসের রোগের একটি সমষ্টি। এই সমস্যাটি মূলত ফুসফুসের সেই টিস্যুগুলোকে আক্রান্ত করে যা বাতাসের থলি বা অ্যালভিওলাইয়ের চারপাশ ঘিরে থাকে। সময়ের সাথে সাথে এই টিস্যুগুলো শক্ত ও ক্ষতবিক্ষত (Scarring) হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ফুসফুসের ফাইব্রোসিস। এর ফলে ফুসফুস পর্যাপ্ত অক্সিজেন রক্তে সরবরাহ করতে পারে না।
নিচে এই জটিল ফুসফুসের রোগটির কারণ, লক্ষণ এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ফুসফুসের ফাইব্রোসিস বা টিস্যু শক্ত হয়ে যাওয়া অনেকটা ত্বকের ক্ষতের মতো। একবার ফাইব্রোসিস হয়ে গেলে সেই টিস্যু পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসা কঠিন। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ চিনে চিকিৎসা শুরু করাই সুস্থ থাকার একমাত্র পথ।
ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ (ILD) কেন হয়?
ILD-এর সঠিক কারণ সবসময় জানা যায় না (ইডিওপ্যাথিক), তবে সাধারণ কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো:
-
পেশাগত ও পরিবেশগত কারণ: যারা দীর্ঘসময় ধরে কয়লার গুঁড়ো, সিলিকা, অ্যাসবেস্টস বা পাখির বিষ্ঠার সংস্পর্শে থাকেন, তাদের ফুসফুসে প্রদাহ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
-
অটোইমিউন রোগ: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা লুপাসের মতো রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত ফুসফুসের টিস্যুকে আক্রমণ করে।
-
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ক্যান্সারের কিছু কেমোথেরাপি বা হৃদরোগের নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের কারণেও ফুসফুসে ফাইব্রোসিস হতে পারে।
-
সংক্রমণ: সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুতর কোভিড-১৯ পরবর্তী জটিলতা হিসেবে অনেকের ফুসফুসে দীর্ঘস্থায়ী ফাইব্রোসিস দেখা দিচ্ছে।
চিনে নিন ৫টি প্রধান লক্ষণ
ILD-এর লক্ষণগুলো খুব ধীরগতিতে প্রকাশ পায়, যা অনেকেই সাধারণ বয়সজনিত সমস্যা ভেবে ভুল করেন:
১. শুকনো কাশি: মাসের পর মাস ধরে চলতে থাকা অস্বস্তিকর শুকনো কাশি।
২. শ্বাসকষ্ট: শুরুতে কেবল পরিশ্রমের সময় শ্বাসকষ্ট হলেও ধীরে ধীরে বিশ্রামের সময়ও দম নিতে কষ্ট হয়।
৩. আঙ্গুলের মাথার পরিবর্তন (Clubbing): অক্সিজেনের অভাবে হাতের আঙ্গুলের ডগা ফুলে গিয়ে ড্রামস্টিকের মতো আকার ধারণ করতে পারে।
৪. বুকে অস্বস্তি ও ক্লান্তি: অল্প কাজেই প্রচণ্ড দুর্বলতা এবং বুকের খাঁচায় টান অনুভব করা।
৫. ক্র্যাকল সাউন্ড: চিকিৎসকরা স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করার সময় ফুসফুসে এক ধরনের ‘মচমচে’ শব্দ (Velcro crackles) পান।
‘এন্টি-ফাইব্রোটিক’ থেরাপি ও জেনেটিক্সচিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক উন্নতিতে এন্টি-ফাইব্রোটিক (Anti-fibrotic) নামক কিছু ওষুধ এসেছে (যেমন- পিরফেনিডোন এবং নিন্টেডানিব), যা ফুসফুসের ক্ষত তৈরির গতিকে কমিয়ে দেয়। এছাড়া বর্তমানে জেনেটিক টেস্টিংয়ের মাধ্যমে আগেভাগেই নির্ণয় করা সম্ভব যে কারো ফুসফুসে ফাইব্রোসিসের বংশগত ঝুঁকি আছে কি না। এর ফলে লক্ষণ প্রকাশের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আধুনিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
ILD-এর চিকিৎসা মূলত রোগের কারণ এবং অবস্থার ওপর নির্ভর করে:
-
ওষুধ: প্রদাহ কমানোর জন্য কর্টিকোস্টেরয়েড বা ইমিউনোসপ্রেসেন্ট ওষুধ দেওয়া হয়। ফাইব্রোসিস রুখতে এন্টি-ফাইব্রোটিক থেরাপি দেওয়া হয়।
-
অক্সিজেন থেরাপি: যাদের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা খুব কমে যায়, তাদের কৃত্রিম অক্সিজেন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
-
পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন: এটি একটি বিশেষ ব্যায়াম ও শিক্ষা প্রোগ্রাম যা রোগীর ফুসফুসের কার্যক্ষমতা এবং সহনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।
-
ফুসফুস প্রতিস্থাপন (Lung Transplant): যদি ওষুধে কাজ না হয় এবং ফাইব্রোসিস চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে শেষ চিকিৎসা হিসেবে ফুসফুস প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
সতর্কতা ও জীবনযাত্রা:
ধূমপান বর্জন করা ILD রোগীদের জন্য বাধ্যতামূলক। এছাড়াও বাড়ির ভেতরে ধুলোবালি বা অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান কমিয়ে রাখা এবং নিয়মিত ফুসফুসের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা (Spirometry) করানো জরুরি।
