x
d o c t o r s 2 4
23 Jan

রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া শব্দটির সাথে আমরা পরিচিত হলেও, এর সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ‘অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া’ নিয়ে জনমনে ধারণা খুবই সামান্য। অস্থিমজ্জা যখন শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় রক্তকণিকা তৈরি করা বন্ধ করে দেয়, তখনই এই প্রাণঘাতী অবস্থার সৃষ্টি হয়। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এই রোগ চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার অন্তত ৬০ দিন বা দুই মাস আগে থেকেই শরীর কিছু বিশেষ লক্ষণ প্রকাশ করতে শুরু করে।

অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া কেবল সাধারণ আয়রনের ঘাটতি নয়, এটি একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত জটিল শারীরিক অবস্থা। আমাদের হাড়ের ভেতরে থাকা মজ্জা বা ‘বোন ম্যারো’ হলো লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা এবং অণুচক্রিকা তৈরির কারখানা। যখন এই কারখানাটি অকেজো হতে শুরু করে, তখন শরীরে অক্সিজেনের অভাব ঘটে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তলানিতে ঠেকে এবং রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সময়মতো শনাক্ত করতে না পারলে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ছাড়া রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

২ মাস আগে শরীরে প্রকট হওয়া ৬টি প্রধান লক্ষণ

সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল কেস স্টাডিগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এমন ৬টি লক্ষণের কথা জানিয়েছেন, যা অন্তত দুই মাস আগে থেকে শরীরে উঁকি দেয়:

  • ত্বকে লালচে বা বেগুনি ছোপ (Petechiae): কোনো আঘাত ছাড়াই ত্বকের নিচে ছোট ছোট লাল বা বেগুনি রঙের ফুসকুড়ির মতো দাগ দেখা দিতে পারে। এটি আসলে অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট কমে যাওয়ার কারণে ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণের বহিঃপ্রকাশ।

  • অস্বাভাবিক দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ: ব্রাশ করার সময় মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা ছোটখাটো কাটাকুটিতে রক্ত বন্ধ না হওয়া—এই লক্ষণগুলো দুই মাস আগে থেকেই ঘনঘন দেখা দিতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব অস্বাভাবিক দীর্ঘ হতে পারে।

  • ঘনঘন জ্বরের সংক্রমণ: শ্বেত রক্তকণিকা বা ডব্লিউবিসি (WBC) কমে যাওয়ার ফলে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। ফলে কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই বারবার জ্বর আসা বা ছোটখাটো ইনফেকশন সহজে না সারা অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার আগাম বার্তা।

  • নাক দিয়ে রক্ত পড়া (Epistaxis): কোনো কারণ ছাড়াই হুটহাট নাক দিয়ে রক্ত পড়া এবং এটি বারবার ঘটা একটি অত্যন্ত গুরুতর লক্ষণ যা অস্থিমজ্জার বিকলতাকে নির্দেশ করে।

  • প্রবল বুক ধড়ফড় ও মাথা ঘোরা: লোহিত রক্তকণিকার ঘাটতির ফলে হৃদপিণ্ডকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। রোগী যখন সোজা হয়ে দাঁড়াতে যান বা হালকা কাজ করেন, তখনই মাথা ঘোরানো এবং হৃদস্পন্দনের গতি তীব্র হওয়া শুরু হয়।

  • ত্বকের অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে ভাব: শরীরে রক্তের প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে ঠোঁট, হাতের তালু এবং চোখের নিচের অংশ মোমের মতো ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সাধারণ রক্তশূন্যতার চেয়ে এই ফ্যাকাশে ভাব অনেক বেশি প্রকট হয়।

রোগের প্রকৃতি ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে বিষয়গুলো জানা জরুরি:

  • ঝুঁকির কারণ: মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, কেমোথেরাপির প্রভাব, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং কিছু বিশেষ ভাইরাসের কারণে এই রোগের সূত্রপাত হতে পারে।

  • শনাক্তকরণ: সিবিসি (CBC) পরীক্ষায় রক্তকণিকা কম পাওয়া গেলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ‘বোন ম্যারো বায়োপসি’ করার পরামর্শ দেন।

  • বয়স: এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে, তবে কিশোর এবং বয়স্কদের মধ্যে এর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

প্রতিকার ও জনসচেতনতা

অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া থেকে মুক্তির উপায় হলো দ্রুত রোগ নির্ণয়। দুই মাস আগে থেকে যদি এই সংকেতগুলো খেয়াল করা যায়, তবে ইমিউনোসাপ্রেসিভ থেরাপির মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ রাখা সম্ভব। তবে অনেক ক্ষেত্রে রোগী সাধারণ দুর্বলতা ভেবে ঘরোয়া উপায়ে রক্ত বাড়ানোর চেষ্টা করেন, যা রোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, শরীর কখনো বিনা কারণে সংকেত দেয় না। অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার মতো নীরব ঘাতক থেকে বাঁচতে হলে আমাদের শরীরের ভাষা বুঝতে হবে। বিশেষ করে কোনো চর্মরোগ বা বাহ্যিক আঘাত ছাড়াই যদি রক্তক্ষরণ বা ত্বকে ছোপ দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে হেমাটোলজিস্ট বা রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জীবনদায়ী হতে পারে।

Leave A Comment