x
d o c t o r s 2 4
25 Jan

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন রক্ষকের বদলে ভক্ষকের ভূমিকা নেয়, তখনই জন্ম নেয় ‘পলিমায়োসাইটিস’-এর মতো জটিল ব্যাধি। বিরল এই ইনফ্ল্যামেটরি রোগে পেশি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে অকেজো হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পূর্ণাঙ্গ শারীরিক পঙ্গুত্ব আসার অন্তত তিন মাস আগে থেকেই শরীর ৬টি বিপৎসংকেত দিতে শুরু করে।

পলিমায়োসাইটিস (Polymyositis) মূলত একটি ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহজনিত রোগ। এতে শরীরের ইমিউন সিস্টেম সুস্থ পেশি কোষগুলোকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করে বসে। এর ফলে বিশেষ করে কাঁধ, নিতম্ব এবং ঊরুর পেশিগুলোতে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগটি এক দিনে প্রকট হয় না; বরং এটি তিন মাস ধরে তিলে তিলে শরীরকে গ্রাস করে। প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে গেলে পরবর্তীতে রোগীর স্বাভাবিক হাঁটাচলাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

৩ মাস আগে থেকে প্রকট হওয়া ৬টি প্রধান লক্ষণ

স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, রোগটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর অন্তত ৯০ দিন আগে শরীরের পেশি ও স্নায়ুতন্ত্রে নিচের পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

  • সিঁড়ি চড়তে বা নিচু থেকে উঠতে অস্বাভাবিক কষ্ট: তিন মাস আগে থেকেই রোগী লক্ষ্য করেন যে, আগে অনায়াসেই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারতেন কিন্তু এখন পা যেন ভারী হয়ে আসছে। মেঝে থেকে বা নিচু চেয়ার থেকে ওঠার সময় হাতের ওপর বাড়তি চাপ দিতে হচ্ছে। এটি ঊরুর পেশি দুর্বল হওয়ার প্রথম লক্ষণ।

  • হাত উপরে তুলতে বা চুল আঁচড়াতে ক্লান্তি: কাঁধের পেশি আক্রান্ত হওয়ার কারণে চুল আঁচড়ানো, জামা পরা বা আলমারির উপরের তাক থেকে কিছু নামাতে গেলে হাত দ্রুত অবসন্ন হয়ে পড়ে। পেশির এই ‘প্রক্সিমাল’ দুর্বলতাই পলিমায়োসাইটিসের মূল বৈশিষ্ট্য।

  • খাবার গিলতে গিয়ে বারবার বিষম খাওয়া: এই লক্ষণটি সাধারণত দুই থেকে তিন মাস আগে থেকেই শুরু হয়। গলার পেশি শিথিল হয়ে যাওয়ার ফলে শক্ত খাবার বা তরল গিলতে অস্বস্তি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘ডিসফ্যাজিয়া’ বলা হয়।

  • দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি ও শ্বাসকষ্ট: যদি কোনো ঠান্ডা লাগার ইতিহাস ছাড়াই তিন মাস ধরে শুকনো কাশি থাকে এবং সামান্য হাঁটলে বুক ধড়ফড় করে, তবে বুঝতে হবে প্রদাহ ফুসফুসের পেশি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

  • কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন বা কর্কশ ভাব: হঠাৎ করেই গলার স্বর বসে যাওয়া বা কথা বলার সময় স্বরের পরিবর্তন আসা পলিমায়োসাইটিসের একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস।

  • অত্যধিক ক্লান্তি ও পেশিতে হালকা স্পন্দন: পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও অবসাদ দূর না হওয়া এবং মাঝেমধ্যে পেশির ভেতর ‘টুইচিং’ বা থরথর করে কাঁপার মতো অনুভূতি হওয়া পেশি কোষ ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়।

পলিমায়োসাইটিস সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য

রোগটির ভয়াবহতা বুঝতে নিচের তথ্যগুলো সহায়ক হতে পারে:

  • আক্রান্তের বয়স: সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি ‘জুভেনাইল মায়োসাইটিস’ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

  • শনাক্তকরণ: রক্তে ‘ক্রিয়েটিনিন কাইনেজ’ (CK) নামক এনজাইমের মাত্রা বৃদ্ধি এবং ‘ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি’ (EMG) পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ নিশ্চিত করা হয়।

  • জটিলতা: সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি হার্টের পেশিকেও আক্রান্ত করতে পারে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রতিকার ও আধুনিক চিকিৎসা

পলিমায়োসাইটিস মোকাবিলায় বর্তমানে ফিজিওথেরাপির পাশাপাশি ‘ইমিউনোসাপ্রেসিভ’ ওষুধের ব্যবহার বেশ কার্যকর। তবে তিন মাস আগের সেই সূক্ষ্ম লক্ষণগুলো চিনতে পারাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে স্টেরয়েড থেরাপির মাধ্যমে পেশির ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, পেশির দুর্বলতাকে কেবল ‘বয়সের দোষ’ বা ‘ক্যালসিয়ামের অভাব’ ভেবে ঘরে বসে থাকবেন না।

আমাদের পেশিই হলো শরীরের চালিকাশক্তি। পলিমায়োসাইটিসের মতো নীরব ঘাতক সেই শক্তিকেই কেড়ে নেয়। তবে শরীর যখন তিন মাস আগে থেকেই বার্তা পাঠাতে শুরু করে, তখন সচেতন হওয়া জরুরি। সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং বিশেষজ্ঞ রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শই পারে একজন রোগীকে আবার নিজের পায়ে দাঁড় করানোর আত্মবিশ্বাস জোগাতে।

Leave A Comment