x
d o c t o r s 2 4
25 Jan

শরীরের চামড়া শক্ত হয়ে যাওয়া বা কুঁচকে যাওয়ার এক বিচিত্র অথচ প্রাণঘাতী রোগ ‘স্ক্লেরোডার্মা’। অকাল পঙ্গুত্ব এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গ বিকল করে দেওয়া এই অটো-ইমিউন ব্যাধিটি পূর্ণ বিস্তারের অন্তত এক বছর আগে থেকেই শরীরকে সংকেত পাঠাতে শুরু করে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই সাতটি আগাম লক্ষণ চিনে নিতে পারলে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘স্ক্লেরোডার্মা’ (Scleroderma) মানে হলো ‘শক্ত চামড়া’। যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজস্ব কোলাজেন প্রোটিনকে অতিরিক্ত পরিমাণে তৈরি করতে বাধ্য করে, তখন ত্বক এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ টিস্যুগুলো পাথরের মতো শক্ত হতে শুরু করে। তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। এক বছর ধরে তিলে তিলে শরীর কিছু অস্বাভাবিক বার্তা দেয়, যা আমাদের সাধারণ সচেতনতার অভাবে ধরা পড়ে না।

১ বছর আগে শরীরে ফুটে ওঠা ৭টি প্রধান লক্ষণ

রিউমাটোলজিস্টদের দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ে যাওয়ার অন্তত ১২ মাস আগে নিচের এই পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হতে থাকে:

  • রেইনল্ডস ফেনোমেনন (আঙুলের রং পরিবর্তন): স্ক্লেরোডার্মার সবচেয়ে শক্তিশালী আগাম বার্তা এটি। সামান্য ঠান্ডায় বা মানসিক চাপে হাতের আঙুল প্রথমে সাদা, তারপর নীল এবং শেষে লাল হয়ে যায়। এটি রক্তনালীর অস্বাভাবিক সঙ্কোচনের ফলে ঘটে।

  • সকালে আঙুল বা হাত ফুলে যাওয়া: ঘুম থেকে ওঠার পর যদি দেখেন হাতের আঙুলগুলো সসেজের মতো ফুলে আছে (Puffy hands) এবং মুষ্টিবদ্ধ করতে সমস্যা হচ্ছে, তবে সাবধান হতে হবে। এটি টিস্যুর ভেতরে জলীয় পদার্থ জমার প্রাথমিক ধাপ।

  • ত্বকের উজ্জ্বলতা হারিয়ে মোমের মতো হওয়া: এক বছর আগে থেকেই দেখা যায় হাতের তালু বা হাতের পেছনের ত্বক অস্বাভাবিক মসৃণ বা টানটান হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ লোশন বা তেল ব্যবহার করেও ত্বকের এই কৃত্রিম টাইট ভাব কমে না।

  • ক্রনিক বুকজ্বালা ও হজমের সমস্যা: স্ক্লেরোডার্মা কেবল বাইরে নয়, ভেতরেও আক্রমণ করে। খাদ্যনালীর পেশি শক্ত হতে শুরু করার ফলে প্রায় ১২ মাস আগে থেকেই মারাত্মক অ্যাসিডিটি বা খাবার গিলতে অস্বস্তি দেখা দেয়।

  • মুখ ছোট হয়ে আসা ও কুঁচকানো রেখা: আয়নায় তাকালে যদি মনে হয় আপনার মুখ খোলার ক্ষমতা কমে আসছে এবং ঠোঁটের চারপাশে সরু সরু লম্বাটে ভাঁজ তৈরি হচ্ছে, তবে এটি কোলাজেন জমার একটি স্পষ্ট সংকেত।

  • বিরামহীন জয়েন্টে ব্যথা ও জড়তা: কোনো আঘাত ছাড়াই আঙুল, কবজি বা হাঁটুতে ব্যথা শুরু হওয়া এবং বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর আড়ষ্ট হয়ে থাকা।

  • বিনা পরিশ্রমে ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট: ফুসফুস বা হৃদপিণ্ডের চারপাশের পর্দা শক্ত হতে শুরু করলে সামান্য চলাফেরাতেই হাপিয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দেয়, যা অন্তত এক বছর আগে থেকেই মৃদুভাবে শুরু হয়।

স্ক্লেরোডার্মা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

এই রোগটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে এটি লিভার ও কিডনির স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে:

  • ঝুঁকির হার: পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই রোগে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি আক্রান্ত হন, বিশেষ করে ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সের মধ্যে।

  • ধরন: এটি মূলত দুই ধরণের— ‘লোকালাইজড’ (যা কেবল ত্বকে সীমাবদ্ধ) এবং ‘সিস্টেমিক’ (যা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গকেও আক্রমণ করে)।

  • শনাক্তকরণ: ‘ANA’ নামক রক্ত পরীক্ষা এবং নখের গোড়ার রক্তনালী পরীক্ষা (Nailfold Capillaroscopy) করে এই রোগ নিশ্চিত করা যায়।

প্রতিকার ও সচেতনতা

স্ক্লেরোডার্মা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব। তবে মূল সমস্যা হলো দেরি করে রোগ নির্ণয়। যখন ত্বক পুরোপুরি পাথরের মতো হয়ে যায়, তখন চিকিৎসা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এক বছর আগে থেকে পাওয়া এই লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জীবনদায়ী হতে পারে।

আমাদের শরীর যখন কথা বলে, তখন তা শোনা বুদ্ধিমানের কাজ। স্ক্লেরোডার্মা কোনো সাধারণ চর্মরোগ নয়, এটি একটি জীবনব্যাপী লড়াই। সচেতনতাই পারে এই পাথর হয়ে যাওয়া জীবনের গতিকে স্বাভাবিক রাখতে।

Leave A Comment