x
d o c t o r s 2 4
26 Jan

রক্তনালীর দেওয়াল ফুলে ওঠা বা প্রদাহজনিত এক জটিল ব্যাধি ‘ভাসকুলাইটিস’। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন ভুলবশত রক্তনালীকে আক্রমণ করে, তখনই এই সংকটের সূত্রপাত। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার মতো চূড়ান্ত বিপর্যয়ের অন্তত চার মাস আগে থেকেই শরীর ৬টি বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে বড় বিপদের পূর্বাভাস দেয়।

ভাসকুলাইটিস (Vasculitis) কোনো একক রোগ নয়, বরং এটি একগুচ্ছ শারীরিক অবস্থার সমষ্টি যেখানে ধমনী, শিরা এবং সূক্ষ্ম কৈশিক জালিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তনালীর পথ সরু হয়ে যাওয়ার ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে এই রোগটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা নেই বললেই চলে। অথচ প্রাথমিক স্তরে এটি শনাক্ত করা না গেলে কিডনি ফেইলিওর, অন্ধত্ব কিংবা পক্ষাঘাতের মতো ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ভাসকুলাইটিস হঠাৎ করে আক্রমণ করলেও এর নেপথ্যে অন্তত ১২০ দিন বা চার মাস আগে থেকেই শরীর এক ধরণের ‘প্রদাহজনিত লড়াই’ শুরু করে। এই সময়ে শরীর যে বিশেষ পরিবর্তনগুলো প্রকাশ করে, তা চিনে নেওয়া জীবন রক্ষার সমতুল্য।

৪ মাস আগে থেকে প্রকট হওয়া ৬টি প্রধান লক্ষণ

সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় ভাসকুলাইটিসের ছয়টি প্রাথমিক সংকেত চিহ্নিত করা হয়েছে:

  • ত্বকে বিচিত্র লাল বা বেগুনি ছোপ (Purpura): কোনো চোট বা আঘাত ছাড়াই হাত বা পায়ের চামড়ার নিচে ছোট ছোট রক্তবিন্দুর মতো দাগ দেখা দেওয়া। বিশেষ করে মোজা বা জুতার ঘর্ষণে যেখানে চাপ পড়ে, সেখানে যদি লালচে দাগ তৈরি হয় যা চাপ দিলে ফ্যাকাশে হয় না, তবে তা রক্তনালীর প্রদাহের প্রথম ধাপ।

  • অকারণ জ্বর ও রাতের বেলা ঘাম: কোনো সংক্রমণ বা ঠান্ডা লাগা ছাড়াই যদি টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে শরীর ম্যাজম্যাজ করে এবং রাতে ঘুমানোর সময় শরীর ভিজে যাওয়ার মতো ঘাম হয়, তবে বুঝতে হবে শরীরের ইমিউন সিস্টেম রক্তনালীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

  • হাত ও পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরা বা আকস্মিক দুর্বলতা: চার মাস আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অনুভব করতে পারেন যে, তার হাত বা পায়ের কোনো একটি অংশ প্রায়ই অবশ হয়ে যাচ্ছে। রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে স্নায়ুতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিলে এই স্নায়বিক সমস্যা তৈরি হয়।

  • মাথাব্যথা ও দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তন: বিশেষ করে কানের পাশের রগ বা টেম্পোরাল আর্টারিতে প্রদাহ শুরু হলে তীব্র মাথাব্যথা এবং মাঝেমধ্যে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এটি অবহেলা করলে চিরতরে দৃষ্টি হারানোর ঝুঁকি থাকে।

  • বিনা কারণে দ্রুত ওজন হ্রাস: ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই যদি চার মাসের মধ্যে ৫-১০ কেজি ওজন কমে যায়, তবে তা শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো বড় প্রদাহের লক্ষণ। ভাসকুলাইটিসের ক্ষেত্রে শরীর তার সমস্ত শক্তি এই প্রদাহের বিরুদ্ধে ব্যয় করায় দ্রুত ওজন কমতে থাকে।

  • নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা দীর্ঘস্থায়ী সাইনাস: সাধারণ সাইনাস ভেবে অনেকেই একে এড়িয়ে যান। কিন্তু নাক দিয়ে রক্ত পড়া এবং নাকের ভেতরে ঘা হওয়া এই রোগের একটি অন্যতম দিক, যা অন্তত মাস চারেক আগে থেকেই শুরু হতে পারে।

ভাসকুলাইটিস সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

এই রোগটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু জরুরি পরিসংখ্যান ও সতর্কতা নিচে দেওয়া হলো:

  • কাদের ঝুঁকি বেশি: এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কিছু ধরণ (যেমন জায়ান্ট সেল আর্টারাইটিস) সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের বেশি আক্রান্ত করে।

  • সনাক্তকরণ: রক্তে ‘ESR’ এবং ‘CRP’-এর মাত্রা দেখা এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর ‘বায়োপসি’ করার মাধ্যমে এই রোগ নিশ্চিত করা হয়।

  • অঙ্গহানি: সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি ফুসফুস এবং কিডনিকে স্থায়ীভাবে অকেজো করে দিতে পারে।

প্রতিকার ও আগামীর ভাবনা

ভাসকুলাইটিস চিকিৎসায় বর্তমানে স্টেরয়েড এবং ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধের সফল প্রয়োগ হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সময়মতো রোগ নির্ণয় না হওয়া। চার মাস আগে থেকে শরীর যে সংকেতগুলো দেয়, তাকে সাধারণ ক্লান্তি বা অ্যালার্জি মনে করে সময় নষ্ট করা চলবে না। যদি ওপরের লক্ষণগুলো কারো মধ্যে এক মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তবে অবিলম্বে একজন রিউমাটোলজিস্ট বা রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

রক্তনালী হলো শরীরের জীবনরেখা। সেখানে কোনো অবরোধ বা প্রদাহ তৈরি হওয়া মানে পুরো ব্যবস্থার পতন ঘটা। ভাসকুলাইটিসের লক্ষণগুলো চিনতে পারা মানেই হলো একটি অনিবার্য পঙ্গুত্ব বা অকাল মৃত্যুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

Leave A Comment