x
d o c t o r s 2 4
22 Jan

পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্য এক নতুন আতঙ্কের নাম ‘জায়ান্ট সেল আর্টেরাইটিস’। ধমনীর মারাত্মক প্রদাহজনিত এই রোগটি সঠিক সময়ে শনাক্ত না হলে চিরতরে কেড়ে নিতে পারে চোখের দৃষ্টি। তবে আশার কথা হলো, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চূড়ান্ত আক্রমণের অন্তত ৬০ দিন বা দুই মাস আগে থেকেই শরীর চারটি সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তা দিতে শুরু করে।

জায়ান্ট সেল আর্টেরাইটিস (GCA) মূলত একটি ভাসকুলাইটিস বা রক্তনালীর প্রদাহ, যা প্রধানত মাথার ধমনীগুলোকে, বিশেষ করে রগের পাশের রক্তনালীগুলোকে আক্রমণ করে। একে অনেক সময় ‘টেম্পোরাল আর্টেরাইটিস’ও বলা হয়। যখন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত রক্তনালীর দেওয়ালে আঘাত হানে, তখন সেখানে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। বাংলাদেশে বয়স্কদের মধ্যে অকাল অন্ধত্ব এবং স্ট্রোকের একটি বড় কারণ এই রোগটি, যা অনেক সময় সাধারণ মাইগ্রেন বা বার্ধক্যজনিত সমস্যা ভেবে ভুল করা হয়।

২ মাস আগে থেকে শরীরে প্রকট হওয়া ৪টি প্রধান লক্ষণ

রিউমাটোলজিস্টদের দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, রোগের জটিল পর্যায় শুরু হওয়ার অন্তত আট সপ্তাহ আগে থেকেই নিচের উপসর্গগুলো পর্যায়ক্রমে দেখা দেয়:

  • মাথার ত্বকের অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা (Scalp Tenderness): এটি এই রোগের অন্যতম অদ্ভুত লক্ষণ। দুই মাস আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অনুভব করেন যে, চুলে চিরুনি দিলে বা কেবল মাথায় হাত দিলেই তীব্র ব্যথা লাগছে। চশমা পরলে রগের দুই পাশে অস্বস্তি হওয়াও এই রোগের আগাম বার্তা।

  • খাবার চিবানোর সময় চোয়ালে ক্লান্তি বা ব্যথা (Jaw Claudication): কিছুক্ষণ কথা বললে কিংবা শক্ত কিছু চিবিয়ে খাওয়ার সময় চোয়ালের পেশিগুলোতে খিঁচুনি বা প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভূত হয়। বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে যায়—এমন লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে চোয়ালের রক্তনালীতে প্রদাহ শুরু হয়েছে।

  • দৃষ্টিশক্তির সাময়িক বিভ্রাট (Amaurosis Fugax): হঠাৎ করে এক চোখের সামনে পর্দা পড়ে যাওয়া বা কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবকিছু অন্ধকার দেখা। এটি অন্তত দুই মাস আগে থেকেই মাঝেমধ্যে হতে পারে। একে অবহেলা করা মানে হলো চিরস্থায়ী অন্ধত্বকে নিমন্ত্রণ জানানো।

  • কাঁধ ও নিতম্বের পেশিতে জড়তা ও ব্যথা: অবাক করার মতো হলেও সত্য যে, জায়ান্ট সেল আর্টেরাইটিসে আক্রান্ত ৫০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ‘পলিমায়ালজিয়া রিউম্যাটিকা’ নামক সমস্যা দেখা দেয়। এতে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কাঁধ, ঘাড় এবং নিতম্বের পেশিগুলো প্রচণ্ড শক্ত হয়ে থাকে এবং নাড়াচাড়া করতে কষ্ট হয়।

রোগ নির্ণয় ও কিছু জরুরি তথ্য

এই রোগটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে বিপদ এড়ানো কঠিন হতে পারে:

  • ঝুঁকির বয়স: এই রোগ সাধারণত ৫০ বছরের নিচের ব্যক্তিদের হয় না। ৭০ থেকে ৮০ বছর বয়সীদের মধ্যে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।

  • লিঙ্গভেদ: পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় তিন গুণ বেশি।

  • শনাক্তকরণ: রক্তে ‘ESR’ এবং ‘C-Reactive Protein (CRP)’ এর উচ্চমাত্রা দেখে চিকিৎসকরা রোগটি আঁচ করেন। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ‘টেম্পোরাল আর্টারি বায়োপসি’ করা প্রয়োজন।

প্রতিকার ও আধুনিক চিকিৎসা

জায়ান্ট সেল আর্টেরাইটিসের প্রধান চিকিৎসা হলো উচ্চমাত্রার স্টেরয়েড। তবে এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা। যদি দুই মাস আগের এই লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই চিকিৎসা শুরু করা যায়, তবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে উন্নত ইমিউনোথেরাপি বা বায়োলজিক ওষুধও এই রোগের চিকিৎসায় দারুণ সাফল্য দেখাচ্ছে।

বার্ধক্যের যেকোনো ব্যথাকে কেবল ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। জায়ান্ট সেল আর্টেরাইটিস এমন এক নীরব শত্রু, যা চোখের পলকে জীবনকে অন্ধকারে ঢেকে দিতে পারে। শরীর যখন দুই মাস আগে থেকেই চোয়ালের ব্যথা বা মাথায় চিরুনি দিতে অস্বস্তির মাধ্যমে সংকেত পাঠায়, তখন সেই সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

Leave A Comment