x
d o c t o r s 2 4
27 Jan

লিভার বা যকৃতের এক রহস্যময় ও বিপজ্জনক রোগ ‘অটোইমিউন হেপাটাইটিস’। যখন শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত যকৃতের সুস্থ কোষগুলোকে শত্রু ভেবে আক্রমণ শুরু করে, তখনই এই প্রাণঘাতী প্রদাহের সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যকৃৎ বিকল হওয়ার অন্তত ৯০ দিন বা ৩ মাস আগে থেকেই শরীর ৭টি বিশেষ লক্ষণের মাধ্যমে বিপদের পূর্বাভাস দেয়।

সাধারণত হেপাটাইটিস বলতে আমরা ভাইরাসজনিত সংক্রমণকে বুঝলেও, অটোইমিউন হেপাটাইটিস সম্পূর্ণ ভিন্ন ও জটিল। এটি অনেকটা ঘরের পাহারাদার যখন ঘরের মালিককেই আক্রমণ করে বসে, সেই পরিস্থিতির মতো। বাংলাদেশে লিভার সিরোসিসের অন্যতম এক প্রচ্ছন্ন কারণ হিসেবে এই রোগটিকে চিহ্নিত করছেন চিকিৎসকরা। সময়মতো এটি শনাক্ত করা না গেলে যকৃতের স্থায়ী ক্ষত বা ‘স্কারিং’ তৈরি হয়। তবে স্বস্তির কথা হলো, রোগটি চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার অন্তত ৩ মাস আগে থেকে শরীর নির্দিষ্ট কিছু সংকেত দিয়ে তার আর্তনাদ প্রকাশ করে।

৩ মাস আগে থেকে প্রকট হওয়া ৭টি প্রধান লক্ষণ

লিভার বিশেষজ্ঞ এবং হেপাটোলজিস্টদের মতে, যকৃতের প্রদাহ তীব্র হওয়ার অন্তত ১২ সপ্তাহ আগে নিচের উপসর্গগুলো অনিয়মিতভাবে দেখা দিতে থাকে:

  • অস্বাভাবিক অবসাদ ও শারীরিক ক্লান্তি: এটি এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ আগাম লক্ষণ। ঘুম বা বিশ্রামের পরেও যদি শরীর সারাক্ষণ ভেঙে আসে এবং মনে হয় শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, তবে বুঝতে হবে যকৃৎ তার স্বাভাবিক বিপাকীয় কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

  • ত্বকে বিচিত্র মাকড়সার মতো জাল (Spider Angiomas): ৩ মাস আগে থেকেই ত্বকের ওপর, বিশেষ করে মুখ, ঘাড় বা বুকে মাকড়সার জালের মতো ছোট ছোট রক্তনালীর নকশা ফুটে উঠতে পারে। যকৃৎ যখন হরমোন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তখন রক্তনালীর এই প্রসারণ ঘটে।

  • জয়েন্টে ব্যথা ও পেশি আড়ষ্টতা: অনেক সময় রোগী একে বাতের ব্যথা ভেবে ভুল করেন। অটোইমিউন রোগের কারণে যকৃতের পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন হাড়ের সংযোগস্থলে প্রদাহ শুরু হয়, যা ৩ মাস আগে থেকেই মৃদুভাবে অনুভব করা যায়।

  • ত্বকের চুলকানি ও শুষ্কতা: কোনো চর্মরোগ ছাড়াই পুরো শরীর মাঝেমধ্যে চুলকাতে পারে। যকৃতের পিত্তরস চলাচলে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে তা রক্তে মিশে গিয়ে ত্বকের নিচে অস্বস্তি তৈরি করে।

  • পেটের উপরিভাগে অস্বস্তি বা ভারি ভাব: পাঁজরের নিচে যকৃতের অবস্থানে চিনচিন করে ব্যথা বা সারাক্ষণ পেট ভরা থাকার মতো ভারি ভাব অনুভূত হওয়া যকৃতের আকার বেড়ে যাওয়ার প্রাথমিক সংকেত।

  • প্রস্রাবের রঙের পরিবর্তন ও জন্ডিসের মৃদু আভা: জন্ডিস প্রকট হওয়ার অন্তত ২-৩ মাস আগে থেকেই প্রস্রাবের রং গাঢ় হতে শুরু করে। এর সাথে চোখের সাদা অংশে মাঝেমধ্যে হালকা হলদেটে আভা দেখা দিতে পারে যা আসে এবং চলে যায়।

  • ক্ষুধামন্দা ও বমি বমি ভাব: প্রিয় খাবারের প্রতিও অনীহা তৈরি হওয়া এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হালকা বমি বমি ভাব অনুভব করা যকৃতের বিষক্রিয়া জমার লক্ষণ।

অটোইমিউন হেপাটাইটিস সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য

এই রোগের ভয়াবহতা ও প্রতিকার বুঝতে নিচের তথ্যগুলো অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে:

  • নারীদের উচ্চ ঝুঁকি: পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে বা মধ্যবয়সে।

  • অন্যান্য অটোইমিউন রোগের সংযোগ: যাদের ইতিমধ্যে থাইরয়েড, সিলিয়াক ডিজিজ বা টাইপ-১ ডায়াবেটিস আছে, তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।

  • সনাক্তকরণ: রক্ত পরীক্ষায় লিভার এনজাইম (AST/ALT) এবং বিশেষ অ্যান্টিবডি (যেমন ANA, SMA) পরীক্ষার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়। প্রয়োজনে লিভার বায়োপসি করা হতে পারে।

প্রতিকার ও সচেতনতা

অটোইমিউন হেপাটাইটিস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসায় রোগী সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পেতে পারেন। সাধারণত ‘ইমিউনোসাপ্রেসিভ’ ওষুধের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত সক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শান্ত রাখা হয়। তবে ৩ মাস আগে থেকে পাওয়া এই লক্ষণগুলোকে অবহেলা করে দেরি করলে যকৃৎ প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—যদি ক্লান্তি ও পেটের অস্বস্তি ১ মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞ হেপাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যকৃৎ আমাদের শরীরের প্রধান রাসায়নিক কারখানা। এই কারখানায় যখন নিজের ইমিউন সিস্টেম হানা দেয়, তখন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। ৩ মাস আগে থেকে শরীর যে সংকেতগুলো পাঠায়, তা বুঝতে পারাটাই হলো এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চাবিকাঠি। সচেতনতাই পারে আপনার যকৃৎ এবং আপনার জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে।

Leave A Comment