অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য দাতার দীর্ঘ অপেক্ষা আর অকাল মৃত্যুর হাহাকার হয়তো ফুরিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীরা এখন ল্যাবরেটরিতে রোগীর নিজস্ব কোষ ব্যবহার করে জীবন্ত অঙ্গ বা ‘বায়োইঞ্জিনিয়ারড অর্গান’ তৈরিতে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন। জীবন বাঁচানোর এই নতুন প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের চিরচেনা সংকট চিরতরে ঘুচিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুনিয়ায় এটি এক মহাবিপ্লব। একসময় যা ছিল নিছক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, আজ তা গবেষণাগারের কাঁচের পাত্রে প্রাণ পাচ্ছে। বায়োইঞ্জিনিয়ারড অর্গান হলো এমন এক কৃত্রিম অথচ জীবন্ত অঙ্গ, যা থ্রি-ডি বায়োপ্রিন্টিং এবং স্টেম সেল প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি করা হয়। সহজভাবে বললে, এটি দাতার শরীরের কোনো অঙ্গ নয়, বরং ল্যাবরেটরিতে ‘চাষ করা’ অঙ্গ।
বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ লিভার, কিডনি বা হার্ট বিকল হয়ে মারা যান। প্রধান সমস্যা হলো উপযুক্ত দাতার অভাব এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কর্তৃক সেটিকে প্রত্যাখ্যান (Rejection) করার ঝুঁকি। বায়োইঞ্জিনিয়ারড অর্গানের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক হলো এখানে। যেহেতু এই অঙ্গ তৈরিতে রোগীর নিজস্ব কোষ ব্যবহার করা হয়, তাই শরীর একে বহিরাগত শত্রু মনে করে না। ফলে আজীবন ইমিউনোসাপ্রেসিভ বা কড়া ডোজের ওষুধ খাওয়ার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাবেন রোগী।
কীভাবে তৈরি হয় এই বিস্ময়কর অঙ্গ?
বায়োইঞ্জিনিয়ারিং বা টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
-
কোষ সংগ্রহ: প্রথমে রোগীর শরীর থেকে সুস্থ স্টেম সেল সংগ্রহ করা হয়।
-
স্ক্যাফোল্ড বা কাঠামো তৈরি: থ্রি-ডি প্রিন্টারের মাধ্যমে ওই নির্দিষ্ট অঙ্গের একটি জৈব-কাঠামো তৈরি করা হয়, যা অনেকটা দালান তৈরির কঙ্কালের মতো কাজ করে।
-
কোষ রোপণ: সংগ্রহ করা কোষগুলোকে সেই কাঠামোর ওপর বিশেষ পুষ্টির মাধ্যমে বড় হতে দেওয়া হয়।
-
পরিপক্কতা: কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কোষগুলো বিভাজিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ টিস্যু বা অঙ্গে রূপ নেয়, যা রক্তনালী এবং স্নায়ুর সাথে যুক্ত হতে সক্ষম।
বর্তমানে কৃত্রিম ত্বক, রক্তনালী এবং মূত্রথলি তৈরিতে বিজ্ঞানীরা শতভাগ সাফল্য পেয়েছেন। তবে হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুসের মতো জটিল অঙ্গ তৈরিতে কাজ চলছে পুরোদমে। গবেষকরা মনে করছেন, আগামী এক দশকে ল্যাবরেটরিতে তৈরি কিডনি মানবদেহে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে।
বায়োইঞ্জিনিয়ারড অর্গানের বিশেষ গুরুত্ব:
-
দাতার অভাব দূর: অঙ্গের জন্য মাসের পর মাস মৃত্যুঘণ্টা গুনতে হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী ল্যাবে অঙ্গ তৈরি করা যাবে।
-
শতভাগ ম্যাচিং: রোগীর নিজস্ব ডিএনএ ব্যবহার করায় অঙ্গটি শরীরের সাথে নিখুঁতভাবে মানিয়ে যায়।
-
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাস: প্রতিস্থাপিত অঙ্গের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টি-রিজেকশন ওষুধের প্রয়োজন পড়ে না।
-
অঙ্গ পাচার রোধ: কৃত্রিম অঙ্গ সহজলভ্য হলে অবৈধ অঙ্গ কেনাবেচার মতো অপরাধ নির্মূল হবে।
অবশ্য এই অগ্রগতির পথে নৈতিক বিতর্ক ও আকাশচুম্বী ব্যয়ের মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। একটি কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করা এখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে প্রযুক্তির গণতন্ত্রীকরণ শুরু হলে এর খরচ সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বায়োইঞ্জিনিয়ারড অর্গান কেবল ল্যাবরেটরির কোনো প্রজেক্ট নয়, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে হাঁটছি যেখানে শরীরের কোনো অংশ বিকল হয়ে গেলে গাড়ি মেরামতের মতো নতুন একটি জীবন্ত অঙ্গ লাগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা জয়ী হলে অকাল মৃত্যু শব্দটাই হয়তো অভিধান থেকে মুছে যাবে।
