মানুষের জীবনরহস্যের নীল নকশা বা ডিএনএ-তে থাকা ত্রুটি সংশোধন করে প্রাণঘাতী রোগ নির্মূলের এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে বিশ্ব। ‘জিনোম এডিটিং’ বা জিন প্রকৌশলের এই বৈপ্লবিক অগ্রযাত্রা থ্যালাসেমিয়া, ক্যান্সার ও অন্ধত্বের মতো বংশগত ও জটিল রোগ নিরাময়ে এখন আর নিছক কল্পনা নয়, বরং এক অমোঘ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বহু বছর ধরে ডিএনএ-কে ধরা হতো অপরিবর্তনীয় এক ভাগ্য হিসেবে। কিন্তু ‘ক্রিসপার-ক্যাস৯’ (CRISPR-Cas9)-এর মতো আধুনিক জিনোম এডিটিং টুলের আবিষ্কার সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। সহজভাবে বললে, এটি হলো একটি আণবিক কাঁচি, যা নিখুঁতভাবে ডিএনএ-র নির্দিষ্ট অংশ কেটে বাদ দিতে পারে অথবা সেখানে নতুন ও সুস্থ কোনো জিন যুক্ত করতে পারে। এটি অনেকটা কম্পিউটারে ভুল বানানের ‘টাইপো’ ঠিক করার মতো; যেখানে শরীরের কোষের ভেতরে থাকা ত্রুটিপূর্ণ কোডটি মুছে দিয়ে সেখানে সঠিক তথ্য লিখে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়ার মতো রক্তজনিত বংশগত রোগের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি। প্রতি বছর কয়েক হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মায়, যাদের সারা জীবন রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। জিনোম এডিটিং প্রযুক্তি এই রোগীদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থ্যালাসেমিয়া ও সিকল সেল অ্যানিমিয়া আক্রান্ত রোগীদের শরীরে পরীক্ষামূলকভাবে সফল জিন এডিটিং করা হয়েছে, যা তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী রক্ত গ্রহণ থেকে মুক্তি দিয়েছে।
জিনোম এডিটিং কেন ভবিষ্যতের চিকিৎসায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী?
এই প্রযুক্তির অসামান্য কিছু প্রয়োগ ও সম্ভাবনা চিকিৎসা ব্যবস্থার ভোল পাল্টে দিচ্ছে:
-
বংশগত রোগের স্থায়ী সমাধান: হ্যামোফিলিয়া, সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা মাসকুলার ডিস্ট্রফি-র মতো রোগ যা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানে প্রবাহিত হয়, জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে ভ্রূণ অবস্থাতেই বা পরবর্তীকালে তা চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব।
-
ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি: ক্যান্সার কোষকে শনাক্ত করতে পারে না এমন ইমিউন সেলগুলোকে জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী করে তোলা হয়, যাতে তারা নিজেরাই ক্যান্সার নির্মূল করতে পারে।
-
অন্ধত্ব ও হৃদরোগ প্রতিরোধ: চোখের রেটিনার বিশেষ কিছু জেনেটিক সমস্যা সমাধানে এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী জিন পরিবর্তনে এই প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্য মিলেছে।
-
ভাইরাস নির্মূল: এইচআইভি (HIV) বা হেপাটাইটিস-বি-র মতো ভাইরাস যা ডিএনএ-র ভেতরে লুকিয়ে থাকে, সেগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে এই টুলটি অত্যন্ত কার্যকর।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশে কিছু নৈতিক বিতর্কও রয়ে গেছে। ‘ডিজাইনার বেবি’ বা মানুষের ইচ্ছামতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এছাড়া এই চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী এক দশকে প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে এর খরচ নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে জিনোম এডিটিংয়ের সরাসরি প্রয়োগ না থাকলেও, আমাদের আণবিক জীববিজ্ঞানী ও গবেষকরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণার সাথে তাল মিলিয়ে চলছেন। ঢাকার বিভিন্ন উন্নত ল্যাবরেটরিতে মলিকুলার ডায়াগনস্টিকসের যে চর্চা শুরু হয়েছে, তা এই প্রযুক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
জিনোম এডিটিং কেবল একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, এটি প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের এক চাবিকাঠি। মানুষের ভাগ্যলিপি যেখানে ডিএনএ-র ত্রুটির কাছে হার মেনে যেত, সেখানে আজ মানুষ নিজেই সেই লিপি পুনরায় লেখার সক্ষমতা অর্জন করেছে। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা যদি সঠিক নিয়ম ও নৈতিকতার মধ্যে পরিচালিত হয়, তবে খুব শীঘ্রই হয়তো আমরা এমন এক পৃথিবী দেখব যেখানে বংশগত রোগ শব্দটির অস্তিত্ব কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
