মানুষের জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় কাটে ঘুমে। কিন্তু আপনি কি জানেন, সব ঘুম সমান নয়? ঘুমের একটি বিশেষ পর্যায় রয়েছে যা আমাদের সৃজনশীলতা, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক ভারসাম্যের চাবিকাঠি। একে বলা হয় রেম স্লিপ (REM Sleep)। ২০২৬ সালের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনিদ্রা বা ঘুমের ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় এই রেম স্লিপকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আপনার শরীর কি পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেলেও মন ক্লান্ত থাকছে? সম্ভবত আপনার ‘রেম স্লিপ’-এ সমস্যা হচ্ছে। বিস্তারিত জেনে নিন আজকের প্রতিবেদনে।
রেম (REM) এর পূর্ণরূপ হলো ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’। ঘুমের এই পর্যায়ে আমাদের চোখের মণি দ্রুত নড়াচড়া করে। সাধারণত ঘুমানোর ৯০ মিনিট পর এই পর্যায় শুরু হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই সময়ে আমাদের শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো নিথর হয়ে থাকলেও মস্তিষ্ক থাকে অত্যন্ত সক্রিয়—প্রায় জাগ্রত অবস্থার মতো!
রেম স্লিপ কেন আপনার জন্য অপরিহার্য?
২০২৬ সালের নিউরোসায়েন্সের নতুন গবেষণা অনুযায়ী, রেম স্লিপের গুরুত্ব কেবল স্বপ্ন দেখাতেই সীমাবদ্ধ নয়:
-
স্মৃতি একত্রীকরণ (Memory Consolidation): সারাদিন আমরা যা শিখি বা দেখি, মস্তিষ্ক রেম স্লিপের সময় সেগুলো বাছাই করে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে জমা করে। এটি অনেকটা কম্পিউটারের ‘সেভ’ বাটনের মতো কাজ করে।
-
মানসিক প্রক্রিয়াকরণ: রেম স্লিপকে বলা হয় ‘ইমোশনাল ফার্স্ট এইড’। এটি আমাদের কঠিন বা নেতিবাচক আবেগগুলোকে সামলাতে সাহায্য করে। রেম স্লিপের অভাবে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং বিষণ্ণতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
-
সৃজনশীলতা বৃদ্ধি: গবেষণায় দেখা গেছে, রেম স্লিপের সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ এমনভাবে সংযুক্ত হয় যা জাগ্রত অবস্থায় সম্ভব নয়। এটি জটিল সমস্যার সমাধান এবং নতুন আইডিয়া তৈরিতে সাহায্য করে।
রেম স্লিপ ডিসঅর্ডার: যখন স্বপ্ন হয়ে ওঠে বিপজ্জনক
অনেকে ঘুমের মধ্যে কথা বলেন বা হাত-পা ছোঁড়েন। একে বলা হয় ‘রেম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার’ (RBD)। সাধারণত রেম স্লিপের সময় আমাদের পেশি শিথিল থাকে যাতে আমরা স্বপ্নের বাস্তবায়ন বাস্তবে না করি। কিন্তু এই ডিসঅর্ডার হলে মানুষ স্বপ্নের মতো আচরণ করতে শুরু করে, যা নিজের বা সঙ্গীর জন্য আঘাতের কারণ হতে পারে।
নতুন তথ্য: ২০২৬ সালের ক্লিনিকাল স্টাডি বলছে, যারা মাঝবয়সে নিয়মিত রেম স্লিপ ডিসঅর্ডারে ভোগেন, তাদের ভবিষ্যতে পারকিনসন বা ডিমেনশিয়ার মতো স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই এটি কেবল সাধারণ ‘ঘুমের সমস্যা’ নয়, বরং একটি আগাম সংকেত।
কীভাবে রেম স্লিপের মান উন্নত করবেন?
১. নির্দিষ্ট সময়সূচী: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস মস্তিষ্ককে রেম চক্র পূর্ণ করতে সাহায্য করে।
২. অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন বর্জন: ঘুমানোর অন্তত ৬ ঘণ্টা আগে চা-কফি পরিহার করুন। অ্যালকোহল আপনাকে দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করলেও এটি রেম স্লিপের পর্যায়কে নষ্ট করে দেয়।
৩. নীল আলো থেকে দূরে: শোবার আগে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোন কমিয়ে দেয়, যা রেম চক্রে ব্যাঘাত ঘটায়।
৪. তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: ২০-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা গভীর এবং রেম স্লিপের জন্য আদর্শ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ঘুমের আধুনিক প্রযুক্তি
বর্তমানে স্মার্টওয়াচ বা স্লিপ ট্র্যাকার ব্যবহার করে আপনি নিজেই আপনার রেম স্লিপের পরিমাণ পরীক্ষা করতে পারেন। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মোট ঘুমের ২০% থেকে ২৫% রেম স্লিপ হওয়া প্রয়োজন।
আমরা কতক্ষণ ঘুমালাম তার চেয়ে বেশি জরুরি আমরা কতটা গুণগত (Quality) ঘুম ঘুমালাম। রেম স্লিপ হলো মস্তিষ্কের সেই থেরাপি যা আমাদের প্রতিদিনের মানসিক চাপ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়। যদি আপনি প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখেন বা ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করেন, তবে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করবেন না।
