x
d o c t o r s 2 4
30 Jan

টে-স্যাক্স ডিজিজ (Tay-Sachs Disease) একটি অত্যন্ত বিরল এবং জীবনঘাতী জেনেটিক ব্যাধি। এটি মূলত শরীরে ‘Hexosaminidase A’ (Hex-A) নামক এনজাইমের অভাবের কারণে ঘটে। এই এনজাইমের অভাবে মস্তিষ্কের নিউরনে ‘GM2 গ্যাংলিওসাইড’ নামক চর্বি জাতীয় উপাদান জমতে শুরু করে, যা ক্রমান্বয়ে স্নায়ুতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেয়।

সাধারণত এই রোগ শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রকাশ পায়, কিন্তু ২০২৬ সালের আধুনিক নিউরোলজি গবেষণা বলছে, ‘লেট-অনসেট’ বা দেরিতে প্রকাশ পাওয়া টে-স্যাক্স রোগের ক্ষেত্রে মূল লক্ষণগুলো প্রকট হওয়ার প্রায় ২ বছর আগে থেকেই শরীর ৬টি সূক্ষ্ম সংকেত দিতে শুরু করে। এই সংকেতগুলো চিনতে পারলে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব।

টে-স্যাক্স সাধারণত শৈশবে মারাত্মক হলেও কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। ২ বছর আগে থেকে যে পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়:

১. ভারসাম্য বজায় রাখতে সামান্য অসুবিধা (Mild Ataxia)

রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর অনেক আগে থেকেই রোগী লক্ষ্য করেন যে, তিনি হাঁটতে গিয়ে হালকা টলে যাচ্ছেন বা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আগের মতো আত্মবিশ্বাস পাচ্ছেন না। এটি মস্তিষ্কের সেরিবেলাম অংশে লিপিড জমার প্রথম দিককার সংকেত।

২. সূক্ষ্ম পেশি সঞ্চালনে জড়তা

দৈনন্দিন কাজ যেমন—শার্টের বোতাম লাগানো, কলম দিয়ে লেখা বা চাবি দিয়ে তালা খোলার মতো কাজে আঙুলের সূক্ষ্ম নড়াচড়ায় সমস্যা দেখা দেয়। ২ বছর আগে থেকেই পেশিগুলো তার স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা হারাতে শুরু করে।

৩. হাত-পায়ের পেশিতে কম্পন বা খিঁচুনি (Fasciculations)

বিশ্রামরত অবস্থায় বা হালকা কাজের সময় হাত বা পায়ের পেশি নিজে থেকেই কাঁপতে পারে। অনেক সময় একে সাধারণ স্ট্রেস বা ক্লান্তি মনে করা হয়। কিন্তু টে-স্যাক্সের ক্ষেত্রে এটি স্নায়ু ও পেশির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগাম লক্ষণ।

৪. কথা বলার ধরনে পরিবর্তন (Slurred Speech)

২ বছর আগে থেকেই লক্ষ্য করা যায় যে, দীর্ঘ সময় কথা বললে শব্দ জড়িয়ে যাচ্ছে বা কণ্ঠস্বর কিছুটা কর্কশ বা ধীর হয়ে আসছে। এটি মূলত কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় পেশিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রাথমিক ধাপ।

৫. মানসিক অবসাদ ও মেজাজের পরিবর্তন

নিউরনে চর্বি জমার ফলে মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। রোগী অকারণে বিষণ্ণতা, তীব্র উদ্বেগ বা খিটখিটে মেজাজে ভুগতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে একে মানসিক সমস্যা মনে করা হয়, তবে এর মূল কারণ থাকে স্নায়বিক ক্ষয়।

৬. চোখের রেটিনায় ‘চেরি-রেড স্পট’ এর সূচনা

এটি টে-স্যাক্সের একটি ধ্রুপদী লক্ষণ। যদিও এটি শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে চোখের মণির গভীরে একটি লাল বিন্দু বা দাগ ২ বছর আগে থেকেই তৈরি হতে শুরু করতে পারে। একজন অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞ বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করতে পারেন।

জেনেটিক স্ক্রিনিং ও ক্যারিয়ার টেস্টিং

২০২৬ সালে টে-স্যাক্স প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ‘প্রি-কনসেপশন স্ক্রিনিং’-এ। এখন দম্পতিরা সন্তান নেওয়ার আগেই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারছেন তারা এই রোগের বাহক কি না। এছাড়া আধুনিক ‘এনজাইম এনহ্যান্সমেন্ট থেরাপি’ এখন ক্লিনিকাল ট্রায়ালে রয়েছে, যা মস্তিষ্কে এনজাইমের কার্যকারিতা বাড়ানোর আশা জাগাচ্ছে।

শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি

যদি এই লক্ষণগুলো দেখা দেয় বা পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকে, তবে দ্রুত করণীয়:

  • Hex-A এনজাইম পরীক্ষা: রক্তে এই এনজাইমের মাত্রা পরীক্ষা করা।

  • ডিএনএ বিশ্লেষণ: HEXA জিনের মিউটেশন শনাক্ত করা।

  • সাপোর্টিভ কেয়ার: ফিজিওথেরাপি এবং স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে পেশির কার্যক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করা।

 

টে-স্যাক্স ডিজিজ একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং রোগ। ২ বছর আগের এই লক্ষণগুলো সাধারণ সমস্যার মতো মনে হলেও, এগুলোকে অবহেলা করা মানে মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতি হতে দেওয়া। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক থেরাপি গ্রহণ করলে রোগের গতি কিছুটা ধীর করা এবং জীবনকে অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।

Leave A Comment