x
d o c t o r s 2 4
01 Feb

ক্র্যাবে ডিজিজ (Krabbe Disease) একটি বিরল এবং অত্যন্ত গুরুতর স্নায়বিক ব্যাধি যা মূলত শরীরের ‘মাইলিন শিথ’ বা স্নায়ুর সুরক্ষা স্তরকে ধ্বংস করে দেয়। এটি ‘গ্যালাক্টোসিলসেরামাইডাস’ (GALC) নামক একটি এনজাইমের অভাবের কারণে ঘটে, যার ফলে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ জমতে শুরু করে।

২০২৬ সালের আধুনিক নিউরোজেনেটিক্স গবেষণা বলছে, এই রোগটি যখন তার চরম পর্যায় বা ‘ডিজেনারেশন’ শুরু করে, তার ঠিক ৬ মাস আগে থেকে শরীর চারটি বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে। বিশেষ করে ‘লেট-অনসেট’ (যা শিশু বা প্রাপ্তবয়স্কদের দেরিতে হয়) রোগীদের ক্ষেত্রে এই আগাম লক্ষণগুলো শনাক্ত করা জীবন বাঁচানোর জন্য অপরিহার্য।

ক্র্যাবে ডিজিজ একবার প্রকট হয়ে উঠলে তা দ্রুত গতিতে স্নায়ুতন্ত্রকে অকেজো করে দেয়। তবে ২০২৬ সালের ক্লিনিকাল পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিচে বর্ণিত লক্ষণগুলো রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্তত ৬ মাস আগেই প্রকাশ পায়।

১. দৃষ্টিশক্তির রহস্যময় অবনতি (Optic Atrophy)

ক্র্যাবে ডিজিজের অন্যতম প্রথম টার্গেট হলো অপটিক নার্ভ। রোগের মূল লক্ষণগুলো আসার প্রায় ৬ মাস আগে থেকেই রোগী ঝাপসা দেখা শুরু করেন। এটি সাধারণ চশমার সমস্যা নয়, বরং স্নায়ুর অবক্ষয়। রোগী অনেক সময় অন্ধবিন্দু (Blind spots) অনুভব করেন বা রঙের পার্থক্য বুঝতে হিমশিম খান। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা এখন উন্নত ‘OCT স্ক্যান’-এর মাধ্যমে এই পরিবর্তন ৬ মাস আগেই ধরতে পারছেন।

২. হাঁটাচলায় হঠাৎ ভারসাম্যহীনতা (Unexplained Ataxia)

হাঁটার সময় পায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা বা বারবার হোঁচট খাওয়া ক্র্যাবে ডিজিজের একটি বড় সংকেত। ৬ মাস আগে থেকেই লক্ষ্য করা যায় যে, রোগী সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বা সোজা পথে হাঁটার সময় স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছেন না। এটি পায়ের মাইলিন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়।

৩. হাত-পায়ে তীব্র জ্বালাপোড়া বা অবশ ভাব (Peripheral Neuropathy)

২০২৬ সালের নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্র্যাবে রোগীদের প্রান্তীয় স্নায়ুগুলো (Peripheral Nerves) অনেক আগেই সংকেত পাঠাতে শুরু করে। হাতের তালু বা পায়ের তলায় পিন ফোটানোর মতো অনুভূতি বা মাঝে মাঝে শরীরের কোনো অংশ অবশ হয়ে যাওয়া এর অন্যতম লক্ষণ। ৬ মাস আগে থেকে শুরু হওয়া এই অস্বস্তি ধীরে ধীরে পেশির দুর্বলতায় রূপ নেয়।

৪. মেজাজের পরিবর্তন ও বৌদ্ধিক স্থবিরতা

মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে ব্যক্তির আচরণে পরিবর্তন আসে। যারা আগে খুব কর্মঠ ছিলেন, তাদের মধ্যে অকারণ খিটখিটে মেজাজ বা সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে অর্জিত নতুন দক্ষতাগুলো (যেমন কথা বলা বা খেলা) হঠাৎ করে ভুলে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে শুরু করে।

কেন দ্রুত শনাক্তকরণ জরুরি?

২০২৬ সালে ক্র্যাবে ডিজিজ চিকিৎসায় দুটি যুগান্তকারী পদ্ধতি ফ্রন্টলাইনে চলে এসেছে:

  • জেনেটিক এডিটিং (Gene Editing): নির্দিষ্ট মিউটেশনগুলোকে সংশোধন করার প্রাথমিক ট্রায়ালগুলো সফল হচ্ছে।

  • কর্ড ব্লাড ট্রান্সপ্ল্যান্ট: রোগের লক্ষণ পুরোপুরি প্রকাশ পাওয়ার আগে যদি কর্ড ব্লাড বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা যায়, তবে মস্তিষ্কের অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব। এই ৬ মাসের আগাম সময়কালটিই হলো সেই মোক্ষম সময় যখন ট্রান্সপ্ল্যান্ট সবচেয়ে ভালো কাজ করে।

করণীয় ও রোগ নির্ণয়

যদি পরিবারের কারও এই রোগের ইতিহাস থাকে বা ওপরের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে নিম্নোক্ত পরীক্ষাগুলো করা উচিত:

১. GALC এনজাইম টেস্ট: রক্তে এই নির্দিষ্ট এনজাইমের সক্রিয়তা পরিমাপ করা।

২. ব্রেইন এমআরআই: মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটারের কোনো পরিবর্তন আছে কি না তা দেখা।

৩. জেনেটিক টেস্টিং: GALC জিনের মিউটেশন শনাক্ত করা।

ক্র্যাবে ডিজিজ একটি কঠিন লড়াই, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের হাতে কিছু শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিয়েছে। ৬ মাস আগে থেকে দেখা দেওয়া দৃষ্টির অস্পষ্টতা বা ভারসাম্যের অভাবকে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মনে রাখবেন, ক্র্যাবে ডিজিজের ক্ষেত্রে ‘সময়ই হলো মস্তিষ্ক’ (Time is Brain)—যত দ্রুত ধরা পড়বে, জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা তত বাড়বে।

Leave A Comment